Poet Dalan jahans poem

কবি দালান জাহান এর পরিচিতিঃ

Rating: 4 out of 5.
Poet Dalan jahans poem
Dalan-jahan

এই সময়ের জনপ্রিয় কবি দালান জাহান জন্ম- ২০ অক্টোবর ১৯৮১ সালে ময়মনসিংহ জেলায় মরি চার চর গ্রামের সরকার পরিবারে। পিতা জনাব মোঃ আছির উদ্দিন সরকার এবং মাতা জনাবা মোছাঃ হালিমা খাতুন । স্কুল পড়ার সময়ই ছাপার হরফে প্রকাশিত হয় কবিতা। হাটি হাটি পা পা’র সময়ই শুরু হয় লেখালেখি তাই কারো অনুপ্রেরনার জন্য কবি কে অপেক্ষা করতে হয়নি। নিতান্ত শখের বসেই তাঁর যে লেখালেখির শুরু আজ তাতে দারুণ দায়বদ্ধতা।

বর্তমানে কবি দালান জাহান বাংলায় অনার্স সম্পন্ন করে চাকুরি করছেন। তিনি কবিতা লেখেন নৈঃশব্দ্য সৃষ্টির জন্য। তাই তাঁর কবিতার অর্থ ও সৌন্দর্য নৈঃশব্দ্য নির্ভর । তবে তা সাধারণ কাব্যিকতা নয়। একেবারেই সতন্ত্র তাঁর কণ্ঠস্বর । তাঁর কবিতায় সহজতা ও সুদূরতা, অস্তিত্ব, অস্তিত্বহীনতা এবং মৃত্যু ও মৃত্যুহীনতা হাট ধরাধরি করে চলে । মজ্জাগত বিদ্রোহী হলেও কবি দালান জাহান উচ্চ কন্ঠ নয়। ভরা নদীর মতই তাঁর বিদ্রোহে গতি আছে গর্জন নেই। কবির লেখায় প্রায়শই মা, মানুষ ও মাতৃভূমির প্রতিটি ধূলিকণার জন্য অন্যান্য সবকিছুকে ছাপিয়ে দেখতে পাওয়া যায় অনন্য এক মমত্ববোধ।

এ সমাজের “মানুষ কে মানুষ করার” স্বপ্নটা দেখতে চান লেখার মাধ্যমেই। কবি এক সময় দৃশ্যকাব্যরুপ নাটকের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ব্যাক্তিগত জীবনে কবি এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের বাবা। যারা তাঁর একান্ত বুকের ধন । ঠিক তেমনি তাঁর এক বুকের ধন ” ঘুমাও কামনার সুখ ” কাব্য গ্রন্থটিও।

প্রকাশিত গ্রন্থঃ

১। পেয়ারি (একুশে বইমেলা ২০১৩)
২। ঝলসে যাওয়া শহর (একুশে বইমেলা ২০১৬)
৩। ঘুমাও কামনার সুখ (একুশে বইমেলা ২০১৮)
৪। ব্লাড ফায়ার (একুশে বইমেলা ২০১৮)

সম্পাদনা- সাহিত্য সিঁড়ি (শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক)

প্রকাশিত কাব্যঃ

নদীর কথা,
ভাস্কর্যশিল্পী,
অজ্ঞাত,
অন্ধকারে মুখ চেনা যায়,
তুমি কাঁদলেই কাঁদে বাংলাদেশ

পুরষ্কার ও সন্মাননাঃ

কবি দালান জাহানের কবিতা সমুহঃ

Poet Dalan jahans poem

পৃথিবীর ভ্রমগদ্য

প্রকাশকালঃ ২১.১০.২০২০

রোজ রাতে রাস্তায় ঘুমিয়ে থাকা
বৃদ্ধকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম
দুনিয়ায় এতো জায়গা থাকতে
এখানে ঘুমিয়ে আছো কেন?
অন্ধের মতো বিড়বিড় করে বৃদ্ধটি
পারাপারের ঘাট দেখিয়ে বলেন
তুমি যাতায়াতের পথে ঘর বেঁধেছো কেন?
তার আঁখি ঝেরে আনন্দ বাতাস
ভাগ হয়ে যায় পুরোনো কবরের দিকে
তিনি একটি অস্পষ্ট আঙুল তাক করে বলেন
সমগ্র পৃথিবীর পথ ভ্রমগদ্য
একদিন অন্ধকারকে প্রশ্ন করো
তুমি জন্মেছিলো কেন ?

নিয়তি

প্রকাশকালঃ ২০.১০.২০২০

আমি তার দিকে হেঁটে যাই
যাকে আমি কখনও দেখিনি
আমি তার অপেক্ষায় হয়ে যাই পথ
হারাতে-হারাতে যার নেই কিছু হারাবার।

আমি তার মতো দৃষ্টি মেলি
যে কখনও দেখেনি জগতের আলো
অন্ধকারের চেয়ে বড় কোন দীনতা
আমার অনুভূতিতে নেই।

আমি খুঁজি জলের চেয়ে রঙহীন মুখ
পতঙ্গের চেয়ে ক্ষুদ্র এক গ্রাম
শ্রাবণের জানালায় ভেজা মুদ্রিত মুখোশ
একবিন্দু অশ্রু থেকে একটি নতুন নদী হয়
নিয়তি শুধু লিখে রাখে নাম।

ভাঙন

প্রকাশকালঃ ১৭.১০.২০২০

তিন প্রহরের যন্ত্রণা নিয়ে
একদিন নদী কেঁদে ছিলো
আজ নদীর কান্না বৈধ হয়েছে
গায়ে কথার গন্ধ লাগায়
যে মানুষটি একদা স্নান করে পবিত্র হয়েছিলো
আজ তার মুখ দিয়ে বের হয়ে যায়
গন্ধে ভরা নর্দমার ড্রেন।
পবিত্র ও সুন্দরের বুক চিড়ে
এখন আকাশে ওঠে যাচ্ছে
কালো-কালো মহিষের মেরুদণ্ড।
হেরে গিয়ে কেবলই চিৎকার করে
চারটি সাদা খরগোশ
আদত ভাঙন শুরু হয়েছে নিয়ম ভাঙতেই।

অভিশাপ

প্রকাশকালঃ ১৪.১০.২০২০

ঘুমহীনতার মতো দরিদ্রতা নিয়ে
বস্তি থেকে নেমে আসা কালো মেয়েটি
রোজ সন্ধ্যায় সামনে বসে
রাত বড়ো করার মন্ত্র শিখায়।
কে জানে দিনে-দিনে এই ঘুমহীনতা
কতোটা জনপ্রিয় হয়
কবে না আবার ঘুমহীনতার
রঙিন প্রাসাদ বিক্রি শুরু হয় গরীবের দামে।
পয়সার শুভ্রতায় এপ্রনগুলো সাদা
নীল বোতল ঢুকে হাসপাতালের
পেছনে যায় শতাব্দীর অভিশাপ।

লজ্জা

প্রকাশকালঃ ০৮.১০.২০২০

লজ্জা হলো বিনয়ের প্রথম কাপড়।
এই কাপড় সরে গেলে
পূর্ব-পুরুষের বাড়ি দেখা যায়।
আজকাল জোছনার মতো লজ্জা পড়ে
তালের রসের মতো লজ্জা নিয়ে
জীবনটা ব্যাগে ভরে মেয়েটা ইস্কুলে যায়
মরা-বোয়ালের মতো হা-মুখ করে
একটা ছেলে তাকিয়ে থাকে
যেন কখনও সে তার মা’কে দেখেনি।

কালো মিয়া

প্রকাশকালঃ ০৬.১০.২০২০

কাঁচের মতো কচকচে পথ
আলিঙ্গনে পরিচ্ছন্ন রক্ত
সভ্যতার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয় কান্নার খবর।
কদম মেঘের আড়াল থেকে হেসে ওঠে সূর্যমুখী
শুধু মৃত্যুর জন্যই তার এ-ই হাসি আনন্দ।
তুমি আমি অথবা আমি আমরা
চরিত্রের জন্য চরিত্র হই।
কাল নামের কালো মিয়া
কালো অক্ষরে লিখে রাখে
আমাদের শটতার বয়স।

অভিশাপ

ঘুমহীনতার মতো দরিদ্রতা নিয়ে
বস্তি থেকে নেমে আসা কালো মেয়েটি
রোজ সন্ধ্যায় সামনে বসে
রাত বড়ো করার মন্ত্র শিখায়।
কে জানে দিনে-দিনে এই ঘুমহীনতা
কতোটা জনপ্রিয় হয়
কবে না আবার ঘুমহীনতার
রঙিন প্রাসাদ বিক্রি শুরু হয় গরীবের দামে।
পয়সার শুভ্রতায় এপ্রনগুলো সাদা
নীল বোতল ঢুকে হাসপাতালের
পেছনে যায় শতাব্দীর অভিশাপ।

ফর্দু মিয়া একজন সবজি ওয়ালা

প্রকাশকালঃ ০১.১০.২০২০

ফর্দু মিয়া একজন সবজি ওয়ালা
আলুর ভেতরে সে বিক্রি করে দেয়
উত্তরের বন্যার খবর।

পটলের ভেতরে ভরে সর্বোচ্চ কথা
কেজি ধরে বিক্রি করে
ব্যাবসায়ী রাজের বুক পকেটে।

ফর্দু মিয়ার চোখ ভাঙে বুক ভাঙে
ফর্দু মিয়া কথা কয় কথা শোনে
চ্যুত পাতায় লিখে রাখে

প্রতিবাদের প্রকৃত শিরোনাম
ফর্দু মিয়া আজও বুঝে-না
অন্ধকারে পিতলও পায় স্বর্ণের দাম।

পুতুল খেলা

প্রকাশকালঃ ২৯.০৯.২০২০

বিষন্নতার সবকটি নদী পেরিয়ে জেনেছি
বিষন্নতার কতো শতো রঙ
মেঘ অথবা বৃষ্টির ভয়ে
এখন আর দৌড়ে উঠি না কারও জলটুঙ্গিতে।

জল খেতে-খেতে এখন তৃষ্ণাই মরে গেছে
অপেক্ষা শব্দটির সুরতহাল রিপোর্টে
লিখে দিয়েছে অবাঞ্ছিত বর্ণমালা।
যে জীবন শুধুই মৃত্যুর জন্য এগিয়ে যায়
তার স্বপ্নগুলো নিছক পুতুল খেলা।

সাধুর শোকশব্দ

প্রকাশকালঃ ২৮.০৯.২০২০

রক্তেভেজা আঁচল নিয়ে
প্রতিদিন ঘরে আসে কতগুলো শোকশব্দ
প্রতিদিন দুয়ার ভাঙতে-ভাঙতে
আত্মস্থ করি
হায়েনার চিত্রে সজ্জিত সেই লজ্জিত জীবন।

কোন না কোনভাবে অঙ্কন করি
শিল্পমায়ের দীর্ঘস্থায়ী খাল
সাঁতার কাটি স্নান করি
কতগুলো মুমূর্ষু শব্দের সমন-সর্দিতে।
আজকাল আমাদের বাজে অভ্যাস

শুধু আজকে বেঁচে থাকতে
বিক্রি করে দেই আগামীকালের দাম
আজকাল আমরা আত্মমগ্ন সাধু
আজকের শিরোনাম হাতে পেলেই
ভুলে যাই গতকালের শিরোনাম।

কুকুর নিধন হোক

প্রকাশকালঃ ২০.০৯.২০২০

কুকুর নিধন হোক
স্থিতিস্থাপক বিন্দু থেকে সমানুপাতে ঘরে-ঘরে হৃদয়ে-হৃদয়ে।
কুকুর নিধন হোক হাসপাতালে
হোটেল-মোটেল ইট-পাথরের
জিন্দান দপ্তরে


ফাইলে-ফাইলে কালো বাণ্ডেলে
গ্রামে-মহল্লায় শহরে অলিতে-গলিতে
মা-মেয়ের লুণ্ঠিত চিত্রে
কুকুর মানুষ নিধন হোক।
কুকুর নিধন হোক! কুকুর নিধন হোক!
সবার আগে নিধন হোক
আমাদের মনের কুকুর।

মায়ের মতো মুখ

প্রকাশকালঃ ১৪.০৯.২০২০

আমার গাঁয়ের মতো একটি মুখ
দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে
লুকিয়ে কাঁদে শহরের গলিতে
তার ভয়ঙ্কর সৌন্দর্য
গলে গলে পড়ে বৃষ্টির ফোটার মতো।


আমার নদীর মতো একটি নদী
নিথর দেহ নিয়ে পড়ে থাকে
হাসপাতালের বিছানায়
ঔষধ-ঔষধ গন্ধে পাকস্থলী উদগীরণ করে
দুর্গন্ধযুক্ত সভ্যতার ইট-পাথর।


আমার মায়ের মতো একটি মা
আঁচলে তোলে শরতের মেঘ
খনন করে যায় মাঠের পর মাঠ
অগত্যা লড়াকু বাতাস চিৎকার করে বলে
এ-ই কান্নাকাদাতে কঙ্কাল ছাড়া আর কিছু নেই।


প্রকৃত মানুষের অনাহারে
আজও আমার মা কাঁদে
আমার গ্রাম আমার নদী কাঁদে
এ-ই কান্নার কী শেষ হবে না।

মানুষ খুঁজি

ঘুরিয়ে বলা মানুষগুলো
সবার কাছে প্রিয়
ঘূর্ণি জীবন থমকে যখন
হিসেব করে নিও


সামনে থেকে অনেক মানুষ
ভেতর বড় একা
মানুষ খুঁজি মানুষ খুঁজি
নাই মানুষের দেখা।

তোমার মৃতদেহ

প্রকাশকালঃ ০৮.০৯.২০২০

এখানে একটি মৃতদেহ
পড়ে আছে বছর ধরে
রোদ ঝড় বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে
সে দাঁড়িয়ে থাকে মিনারের মতো


তুমি প্রতিদিন তার বুকের উপর
নির্মাণ করো পৃথিবীর পথ
কিন্তু তোমার দুঃখ আর
জীবিত মানুষের মতো জাগে না


কতো মৃতদেহ বুকে নিয়ে তুমি
সংসার মন্থনে যাও?
গন্ধ চলে গেলে না-কি রুচিহীন মানুষ


ভোর পাঁচটায় ঠিক মানুষের মতো রাগে না
তোমার লাশের গন্ধ বুঝি তাই
তোমার নাকে লাগে না।

কবি ও চিত্রকর

প্রকাশকালঃ ০৫.০৯.২০২০

আদিব হাসলো ভালো ছবি আঁকেন। আম আঁকতে গিয়ে কখনো এঁকে ফেলেন মানুষের মুখ। তুলি ঘষতে ঘষতে মূহুর্তেই উপহার দেন জীবন্ত আকাশ। আবার আকাশ-আকাশ আঁকতে-আকতে একে ফেলেন সমুদ্র ভূমি চাঁদ গ্রহ-তারা।


আদিবের রুমমেট পির্জ পার্বেল না ইংরেজ কেউ নন, বাঙালির ইংরেজি নাম আর কি! তিনি আবার কবিতা লিখেন। এ-ই দু’জনের সম্পর্কটা সাদ্দাম-বুশের সম্পর্কের সাথে তুলনা করা যায়। একটা ফুরসত পেলেই হলো পির্জ পার্বেল আদিব হাসলোর চিত্রে ভুল ধরে বসবেন।


আবার আদিব হাসলো ও ভুল ধরেন পিস পার্বেলের কবিতায়। আবার দু’জন একসাথে থাকেন খান ঘুমান কিন্তু সমালোচনাটা কেউ কাউকে ছাড় দেন না। যেমন কারও সাথে দেখা হলে কোন বন্ধু যদি বলেন, আদিব হাসলো ভালো ছবি আঁকেন পিস পার্বেল, তখন বলে বসেন, বাল আঁকে সে!

যে বুঝে-না রাত আর দিনের রঙ যে বুঝে-না আলো আর অন্ধকারের প্রণয় তার আবার আর্ট ! আদিব বলেন, কবিতায় চিত্রপট থাকতে হয় ইন্দ্রিয়কে নাড়া দিতে হয় অনুভূতি দিয়ে ওর কবিতায় কী আছে এ-র কিছু!!


সামনে প্রদর্শনী আছে, গভীর রাত আদিব হাসলো ছবি আঁকতে ব্যস্ত। নির্বাচিত ছবিগুলোতে দিচ্ছে রঙের শেষ আঁচর। এখন যে ছবিটি তার হাতে তাতে
মাটি ভেদ করে মুখ তুলেছে একটি শিশু বৃক্ষ। পাতাগুলো ছড়িয়ে গেছে সবুজ হৃদয়ের মতো , একটি পা আকাশের মতো বড়ো এগিয়ে আসছে এগিয়ে আসছে।


এখন চাপা দিবে প্রায় তখনই শিশু বৃক্ষের কান্নায় মাটি মেলে ধরে হাত আটকে দিয়েছেন বৃহৎ পা-টি। ছবিটির রঙ থেকে ভেসে আসছে আবহ সঙ্গীতে “শুধু বৃক্ষ নয় এভাবেই দলিত হয় দুর্বল দলিতরা।
পিস পার্বেল বারান্দায় বসে কবিতা লিখছেন। পড়ছেন একটু পর পর শব্দ করে।

“রঙ হলো বিধাতার কান্না
উপলক্ষ পেলেই ছুঁয়ে যায় হৃদয়
চিত্রকর হলো সেই সেই চোখ
যে চোখ প্রথম ভিজে ছিলো রক্তে
সারাটি জীবন ধরে একজন চিত্রকর
যা এঁকে যান তা বস্তুত ঈশ্বরের কান্না ছাড়া আর কিছুই নয়।

দুরত্ব

প্রকাশকালঃ ০৩.০৯.২০২০

গতকাল রাত আমি হেঁটে গিয়েছিলাম
একটি ভৌতিক ফোনের পিছু পিছু
গতকাল রাত জানালার হৃদপিণ্ড ধরে
ঝুলে ছিলো কেউ ঝুলে ছিলো কিছু।
বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে একটি কণ্ঠ
ঢুকে গিয়েছিলো হলুদ নীল স্ক্রিনে
গতকাল রাত চিৎকার করে কেঁদেছিলো
বিগত দু’টি চোখ
আমি বুঝিনি তার মানে।
দুঃখের শব্দ দিয়ে কেউ সাজিয়ে ছিলো
পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃসঙ্গ নদীর সুর
গতকাল রাত কেউ আমাকে প্রশ্ন করেছিলো তুমি কোথায় ?
আমি বলেছিলাম আকাশ থেকেও দূর।

Poet Dalan jahans poem

মানুষ মরে যায় জন্মের আগে

প্রকাশকালঃ ০১.০৯.২০২০

নাম না জানা পাখির ডানায়
একদিন সব দুঃখ দান করে দেব
মাথার উপর ছায়া ফেলে
ওড়ে যাবে দুঃখ পাখি
বুক ফাটা প্রান্তরে বসে তার কান্না দেখব।
সব দায় মুছে ফেলে
দরজায় দাঁড়ানো ভিক্ষুকের হাতে
তোলে দেব জীবনের আগুন মিছিল
রক্তে-রক্তে রক্তাক্ত হবে
ভিখিরির দুর্ভিক্ষ হৃদয়
মৃত্যুর সামনে বসে জীবন দেখব।
মানুষ তো মরে যায় জন্মের আগেই
একদিন জন্ম ও মৃত্যুর মুখোমুখি হবো।

পরজীবী

প্রকাশকালঃ ২৮.০৮.২০২০

বিষণ্ণ পৃথিবীর ডানা ভেঙে
ওড়ে আসে একটি পাখি
তার চোখের আলোয় ঝলসে ওঠে মুখ।
পায়ের নিচে অশ্রুনদী
সে নদী জোয়ার ছাড়াই ভাটা আনে
সে নদী বিদীর্ণ করে যায় মানুষের বুক।
সাদা মেঘের করাত ভেঙে দিগন্ত হয় খুন
বৃষ্টিরা কান্না থামিয়ে ঝরায় রক্তপাত
হাঁটতে হাঁটতে লাল হয়ে যায় আদমের পা।
ছাদ ফুঁড়ে ওড়ে যায় প্রাণ
ঘরমুখী মানুষেরা ঘরে ফিরে যায়
দরজায় খিল দেয় পরজীবী পশু।

সন্তানগুলো বাংলা কবিতার মতো

প্রকাশকালঃ ২৪.০৮.২০২

সন্ত্রাসীরা চুল পাকার আগেই মরে যায় এমন একটা কথার জের-ধরে গুলাগুলি হয়। ছাব্বিশটা গুলি লাগলেও বিপুল ক্রেস্টের জীবন ছিলো। মৃত্যুর আগে বিপুল ক্রেস্ট ছেলে জাহিদ ক্রেস্টকে বললেন , বাবা তোর জন্য অঢেল সম্পত্তি রেখে যাচ্ছি। তুই একটা কাজ করবি বাপ! ভাড়া করা গুন্ডা মাস্তানদের বিশ্বাস করবি না। সেজন্য তুই দশটা বিয়ে করবি। প্রতি বছর সন্তান নিবি।


একদিন তারাই একটা বিশাল বাহিনী হবে। নেতৃত্ব দিবে পুরো ঢাকা শহরের। এই বলে হাওয়া চুবানো বন্ধ করেন বিপুল ক্রেস্ট। বাংলা মোটর এ্যালিফেন্ট রোড ধানমন্ডি কাঁটাবন সব জায়গাতেই রয়েছে তার বাবার বাড়ি ও ব্যবসা।


বাবাকে দেওয়া কথানুসারে জাহিদ ক্রেস্ট দশটা বিয়ে করলেন। দশ জনের গর্ভেই এলো দশ সন্তান। প্রতি বছর সন্তান উৎপাদনের শিল্প-কারখানা কখন যে, কতো সংখ্যায় দাঁড়ালো সে হিসেব এখন আর জাহিদ ক্রেস্টের জানা নেই। জাহিদ ক্রেস্টের ও এখন শরীর দুর্বল হয়েছে বিশেষ করে যখন শুনে আপনি তো ষাট -সত্তুর জন সন্তানের পিতা।


এক সময় জাহিদ ক্রেস্টের ইচ্ছে হলো সব সন্তানদের সাথে সৌজন্যে সাক্ষাত করার। সেই অনুযায়ী কাজ হলো প্রথম মিলনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো। জাহিদ ক্রেস্ট ভাড়া করলেন ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড়ো হল। হলে ঢুকার সময় জাহিদ ক্রেস্ট দেখলেন দরজার সামনে কিছু তরুণ-তরুণী দাঁড়িয়ে আছে।


তিনি তার পি এস কে জিজ্ঞেস করলেন এরা কারা? পি এস বললেন , আপনার সন্তান স্যার তাহলে এরা বাহিরে কেন? কি করবে স্যার ভেতরে তো জায়গা নেই! জাহিদ ক্রেস্ট রেগেমেগে ধমক দিয়ে বললেন কি বলছ ? এরপর জাহিদ ক্রেস্ট হলের ভেতরে প্রবেশ করলেন, জাহিদ ক্রেস্ট দেখলেন, ক্রিকেটের গ্যালারির মতো পরিপূর্ণ শিশু-কিশোর।


জাহিদ ক্রেস্ট মায়া ভরা নজরে তাকালেন শিশু কিশোরের দিকে (নিজের সন্তান বলে কথা) কিন্তু তিনি দেখলেন একেকটি সন্তান একক রকম হয়েছে কোনটা দেখতে ইংরেজের মতো ফর্সা কোনটা নিগ্রোর মতো কালো কোনটা আরবীয় সৌষ্ঠব কোনটা ফরাসির মতো আবার মাঝে মাঝে বাঙালির মতো ও দেখা যায়।


জাহিদ ক্রেস্ট পি এস কে জিজ্ঞেস করলেন, এ-ই অবস্থা কেন? পি এস বললেন, আমি কী করে বলব স্যার,, আপনি ওদের মায়েদের জিজ্ঞেস করুন তারাই ভালো বলতে পারবেন। জাহিদ ক্রেস্ট তখন একটু বাঁকা হেসে বললেন , আমার সন্তানগুলো দেখছি অকবির অগোছালো হাইব্রিড কবিতার মতো।

Poet Dalan jahans poem

আতঙ্ক

প্রকাশকালঃ ১৯.০৮.২০২০

সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো
তোমার কাছে সুন্দর কী?
আমি লিখে দিলাম দুই অক্ষরের একটি নাম।
তারপর তার নাম থেকে
উধাও হলো একটি বর্ণমালা।
এখন সে আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করে না
হয় তো এটাই ভয় তার
এরপর যদি নিজেই উধাও হয়ে যায়।

পৃথিবীর শেষ আদমেরা

প্রকাশকালঃ ১৬.০৮.২০২০

একটি জাহাজের আশায়
ভবিষ্যতহীন অন্ধকারে বসে আছে
শুরু থেকে শেষ আদমেরা
তাদের কপালে খেলা করছে
কতগুলো মৃত্যুহীন বেওয়ারিশ শিশু।

তাদের চোখ থেকে নেমে আসছে
গভীর শীতল অশ্রু বাতাস
একটি রংতুলি মুখ মৃত্যুর মতো
একে যাচ্ছে বেঁকে যাচ্ছে
তাদের মাথায় গজিয়ে উঠছে
চিন্তা ওয়ালা হাঁটুর শিং।

প্রচণ্ড ঢেউয়ে ভেসে গেছে
তাদের হৃদপিণ্ড বিশ্বাস
মাথার খুলি কপালের হাড়
তাদের মস্তিষ্ক খোলা ও এলোমেলো
সেখানে বাসা বেধেছে পরজীবি পাখির ছানা।

রাত্রিরা ঘুমিয়ে গেছে ঝরো পাতার তলে
শুয়োরের শব্দে নড়ে উঠে বুনো জাহাজের মাস্তুল
তারাই এখন পৃথিবীর শর্তহীন উত্তরাধিকারী।
কিন্তু সূর্যের সাহস নিয়ে
এখনও তাকিয়ে আছে একটি বৃদ্ধ চোখ
জাহাজে জ্বলে উঠছে মানুষের বাতি।

বেদনার সঠিক উচ্চারণ

প্রকাশকালঃ ১৫.০৮.২০২০

আলোয় ভেজা
একটি সাদা কালো চশমা
হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় একাত্তরে
তেজস্বী কণ্ঠে ওঠে আগুন আওয়াজ
দীপ্ত প্রদীপ প্রলয়ের ধ্বনি
সিঁড়ি ভেঙে আসে আত্মার হুংকার
আজও প্রতিদিন বাতাসে কান্না শুনি
তোমাকে হারিয়ে বঙ্গপিতা
হারানো শব্দটি হারিয়েছে
হারানোর শব্দের গভীর অর্থ
অথবা বেদনার সঠিক উচ্চারণ ধ্বনি।

Poet Dalan jahans poem

কাঁটাতার

প্রকাশকালঃ ১৩.০৮.২০২০

নিরক্ষর দু’টো হাত
কুড়িয়ে আনে ঝরাপাতাদের ঝরো ক্রন্দন
অদূরে বেজে উঠে হারমোনিয়াম
অভিশাপে পুড়ে যায় ভালোবাসার বন।

চিরতরে নিভে যাওয়া প্রদীপ
যুগান্ত হাহাকার নিয়ে
জ্বলে উঠে আবার
কেন তারে-ই পেতে চায় মন
ভেঙে সব বন্ধন কাঁটাতার।

অন্ধকারে অদ্ভুত হাত

প্রকাশকালঃ ১১.০৮.২০২০

পাখির মতো আকাশে ওড়ে
একটি সবুজ সমতল ছায়া
তার শীতল স্পর্শে প্রজনন উর্বর
পরিশ্রমী প্রজাপতিরা
আঘাতে আঘাতে লাল স্পন্দনহীন পৃষ্ঠা
ধরনীর পথে পথে পাতা আলপিন।

অন্ধকারে কাঁদে অদ্ভুত হাত
সমতল ছায়া ভেসে যায় সমুদ্র মায়ায়
নড়ে নড়ে জেগে ওঠে, সবচেয়ে ক্ষুধার্ত সিংহের দাঁত
বুকের বোতাম খোলে দাঁড়িয়ে থাকে বুক
অনুভূতি পূর্ণ ইথারে কাঁদে দুঃখের মতো শিল্পের ছবি।

দুঃসহ শূন্যতা মাখা পৃথিবীর মুখে
শিল্পী এঁকে দেয় জন্মের দাগ
তারও অনেক উপরে বসন্ত বঁধু
দু’হাতে ছড়িয়ে যায় রঙ্গ নদী
বীণার চুম্বনে গর্ভবতী, বাতাসের ঠোঁট
কাঁপতে কাঁপতে প্রসব করে প্রেম
জীবনের অধিক আয়োজনে
সঙ্গীতে সঙ্গীতে কেঁপে ওঠে বেশ্যার গান।

তবুও নদী নিয়ম করে অবসাদে যায়
চোখের জলে ডোবে ডোবে ফুরিয়ে যায় দান
সন্ধ্যায় শাঁখ বাজে বাঁশি বাজে
মসজিদে মসজিদে ধ্বনিত হয় আল্লাহ্ আকবার
অন্তহীন ভাবনায় অগণন বছর ধরে
ঈশ্বরের দিকে মুখ তোলে
তাকিয়ে থাকে বামন কুকুর।

ঈশ্বরের কান্না

প্রকাশকালঃ ১০.০৮.২০২

“রঙ হলো বিধাতার কান্না
উপলক্ষ পেলেই ছুঁয়ে যায় হৃদয়
চিত্রকর হলো সেই-সেই চোখ
যে চোখ প্রথম ভিজে ছিলো রক্তে
সারাটি জীবন ধরে একজন চিত্রকর
যা কিছু এঁকে যান
তা বস্তুত ঈশ্বরের কান্না ছাড়া
আর কিছুই নয়।

Poet Dalan jahans poem

বেঁচে থাকি ঘাসের মতো

প্রকাশকালঃ ০৯.০৮.২০২

আমাদের আত্মা ঝুলে থাকে
ছাদের রশিতে ঝুলানো ভেজা কাপড়ে
যতক্ষণ না রোদ অপহরণ করে জলের কণা
ততক্ষণ আমরা বেঁচে থাকি ঘাসের মতো।

আমাদের প্রশ্নগুলো দণ্ড নিয়ে
পৃথিবীর বাইরে নির্বাসনে যায়
একটি তারকালোক তাকিয়ে থাকে
আমাদের ঠোঁটের উপর
আমরা তাকিয়ে থাকি টাওয়ারে স্থাপিত
উজ্জ্বল ছুরির দিকে।

এবং একসময় আমরা মিলিয়ে যাই
নিঃশ্বাসের দুই-দুয়ারে
আমাদের গর্তগুলো বড়ো হয় পাপের সমানুপাতে।

শ্রাবণ চিত্র

প্রকাশকালঃ ০৮-০৮-২০২০

জীবনের সবকিছু দিয়ে
একটি শ্রাবণের ছবি আঁকতে চেয়েছি
ক্যানভাসে আঁকা কোন অভিমানী শিল্পীর
তেলে-ভেজা আকাশ নয়
আমি আঁকতে চেয়েছি সেই শ্রাবণ
যে আকাশে ঝাড়া দিলে টিপ টিপ মেঘ পড়ে
যে শ্রাবণ নিয়ে বেঁচে থাকে বর্ষার জননী
নদী ও নগরের দুঃখবালা
হৃদয়-ভাঙা শিশির দরজায় পড়ে থাকে
পৃথিবীর ওজন সম জলের উৎস
যে শ্রাবণ সবসময়ের ঈশ্বরের মতো রয়ে যায়
প্রতিদিন জীবন বিক্রি করে বাড়ি ফেরা
মজদুরের হৃদয়ে-হৃদয়ে।

ভয়ে ভরা রক্তদুধ

প্রকাশকালঃ ০৭.০৮.২০২০

চোখের বারুদে ভরে যায় সময়
ঠোঁটের ইস্পাতে কেটে যায় দাঁড়কাকগুলো।
শব্দ ক্ষুধার মতো অনাহারে-অনাহারে
অনাশ্রিত কলমগুলো
প্রতিরাত জননীর রক্তদুধ খায়
ঢুলতে-ঢুলতে মদ্যপ চোখগুলো
ডোবে যায় ধোঁয়ার কাপে।

শহর বলতেই এখন ইট-পাথরের বাড়ি
মানুষ বলতেই মন্ময়-ভয়
ভয়ের বরফে জমে থাকে মানুষের নাড়ি।

বসে আছি দু-হাত তুলে

প্রকাশকালঃ ৩০-০৭-২০২০

একটি গল্প লিখবো বলে
আমি সারারাত বসে আছি আকাশ তলে
কুয়াশার-মদ জল হয়ে ঢুকে পড়ছে
শিরায়-শিরায় দলে-দলে
বসে আছি নির্জন-রাত দু-হাত তুলে
নারীর মতো অন্ধ আকাশ তলে।
এ-ই পথেই আসবে সে তারাদের সংসার নিয়ে পৃথিবীর যোগে নব-নতুন শব্দ নিয়ে
নতুন করে লিখবে আবার প্রাক্তন সংলাপ
মৈথুন-মৈথুন মাখন গন্ধ
বৃষ্টির ছন্দে পড়বে গলে
বসে আছি নির্জন-রাত দু-হাত তুলে
নারীর মতো অন্ধ আকাশ-তলে।

Poet Dalan jahans poem

ভাঙা চশমা

প্রকাশকালঃ ২৭-০৭-২০২০

পড়ার টেবিলে পড়ে আছে
একটি ভাঙা চশমা
রক্ত জবার মতো থেঁতলে গেছে যার কাঁচ
আকাশ থেকে নেমে আসা কিছু কালো অক্ষর
চশমাটা জড়িয়ে এমনভাবে কাঁদছে
যেভাবে আমি কেঁদেছিলাম মৃত্যুর আগে।
বিকেল হলেই চশমাটা এখন আমাকে চায়
যেমন আমি চাই বাতাসের খোলা চুল
চশমাটা পড়লেই দেখি
আমার দিকে তাকিয়ে কাঁদছে ঈশ্বর।

সম্পর্ক বলতে বুঝি তিন তাসের খেলা

প্রকাশকালঃ ২৫-০৭-২০২০

বাজি ধরলেই উল্টে যায় নদী
দান লাগলেই উঠে যায় কমলা ঠোঁটের ছাল
পাশে থাকতেই মজা পুকুর
লেহন করো কোন রসিকের গাল
পকেটের সাপগুলো ছেড়ে দিলেই শেষ
ফাউনের কদার্য মুখ ভেঙে আসে জয়ের মালা
একদিন সে জপতে থাকে কলঙ্কিত নাম
যে তোমাকে করতো সবচেয়ে অবহেলা
গণিতের পাঠ নেইনি কভু
হিসেবে বলতে বুঝি সূর্য-ডুবা বেলা
সম্পর্করা জেগে থাকে স্তনের সুখে
সম্পর্ক বলতে বুঝি তিন-তাসের খেলা।

আয়না

প্রকাশকালঃ ২০-০৭-২০২০

কাঁচের আয়নায় দাঁড়ালে তুমি
নিজেকে দেখতে পাবে
সময়ের আয়নায় দাঁড়িয়ে দেখো
পৃথিবী দেখতে পাবে।

জলের আয়নায় দাঁড়ালে তুমি
দেখতে পাবে স্বচ্ছতা আর পবিত্রতার
প্রতিতি-প্রতীক।

রঙের আয়নায় দাঁড়ালে তুমি
দেখতে পাবে
শয়তান কিভাবে মানুষ হয়ে ওঠে।

মানুষের আয়নায় দাঁড়ালে তুমি
দেখতে পাবে তোমার ভেতরের মানুষ।

ক্রেসাস /স্পার্টাকাস

প্রকাশকালঃ ১৭-০৭-২০২০

আমাকে হত্যা করা হবে তাই
পারদের মতো রূপালি হয়েছে সৈনিকের চোখ
আমাকে হত্যা করা হবে তাই
আদেশগুলো ফুটছে হিরোশিমার মতো
আমি এগিয়ে যাচ্ছি জ্বলন্ত আকাশের দিকে
অদূর থেকে ভেসে আসছে
আমার শিশুর কান্না
সাথে একটা তীব্র হেঁসেল ফায়ার ফায়ার…..

আমি আলিঙ্গন করছি মহিমান্বিত
গৌরব আমার
আমি আলিঙ্গন করছি মৃত্যুর মতো
ভেজালহীন সত্যকে
আমি বিশ্বাস করি জন্ম-মৃত্যুের গোলকধাঁধায়
আস্ফালন আর ক্রন্দন ভুলে
একদিন মৃতরাই জেগে উঠবে
একদিন মৃতরাই বুঝে নিবে
পৃথিবীর অধিকার।

অদৃশ্য রক্তজবা

আমার ঘরের সামনে দু’টো রক্তজবা ছিলো
তাদের সুর দুটোর অদৃশ্য সংযোগ ছিলো
আমার হৃদয়ের সাথে।

আমি তাদের গন্ধ নিয়ে হেঁটে যেতাম
ঋতুর-রঙে রঞ্জিত মন্দিরের দিকে
মেথর পট্টির ঝাঁঝালো ঘ্রাণ নিয়ে
আমি ঢুকে যেতাম
সদ্য চুনকাম করা পুটি বালার মাটির ঘরে।

পুটি বালা মাটির মেয়ে
চান্দের আলোর আগে
এগিয়ে আসতো তার অন্ধকার মুখ
কালো হাতের স্বর্গীয় যতনে
সে পাত্রে তুলে দিতো মাটির দুধ মাটির মাংস
সারারাত বৃষ্টি হয়ে ঝরে ঝরে শিরায়-শিরায়
খুব সকালে একখান রক্তজবা চাইতো
মেঘ কালো চুলের খোঁপায়
আমি তারে দিতাম ছিঁড়ে হৃদয়জবা।

আমার বাবা মসজিদে আযান দিতেন
বাতাস কম্পন উঠতো
আসসালাতু খায়রুম মিনান নাউম
মন্দির-মসজিদ পেরিয়ে
আমি দ্রুত হেঁটে যেতাম রক্তজবার দিকে
কিন্তু একদিন এক অর্গানিক ভোরে
রক্তজবা দুটো কেটে নিয়ে যায়
পুরোহিত আর ইমাম
সেই থেকে বুক ফেটে প্রবাহিত রক্তনদী
গাঙের চিনচিন বাতাস কেঁদে কেঁদে কয়
পুটি বালা! পুটি বালারে তোরে পাইতাম
আমি মানুষ হতাম যদি।

আত্মার প্রতিধ্বনি

নীলক্ষার অন্ধকারে
আমি তোমার শব্দ শুনি
পুবের বাতাসে যে রাগ
আমি তার শব্দ শুনি
তুমি শুক্রবারের ডাক দিয়ে যাও
আমি শুক্রবারে তোমায় চিনি
জল কমল কুলকুল করে
আমি তার শব্দ শুনি
মাতৃত্বের প্রবলটানে মাতোয়ারা হয় ভৈরব নদী
আমি ভৈরবী সুরে মুছি তোমার পানি
আমি শব্দ শুনি ভেতর-বাহিরে গঞ্জে-শহরে
সোনার মতো চকচক করে
তোমার আত্মার প্রতিধ্বনি।

চিঠি আসে না

দু’টো সন্তান আর একটি স্বামীর
চৌকাঠ পেরিয়ে
আসে না তোমার চিঠি আসে না
অথচ আমি অপেক্ষায় থাকি
আজ কাল পরশু বছরের শেষ দিনটিও
তোমার জন্য কান্না করে সুখের শিশু
হাসে না তারা কভু হাসে না।

কি একটা ছিলো কি একটা নেই
তন্নতন্ন করে খুঁজি হৃদয় সিন্ধুক
আলমারি উঠোন সারা ঘর
তটস্থ চোখে গৃহিণী বলে হারিয়েছে কী বলো
আমি কী তোমার এতোটাই পর ?
কিন্তু আমি কী করে বলব
একুশ বছর ধুঁইনি যে শার্ট
লেগে আছে সেই গন্ধ যা তোমার ও চেনা।

এ-ই যে এখন বিষন্ন বেলা
বোকা মাছেরা করে যায় খেলা
আকাশেতে নোনা মেঘ আর ভাসে না
বহুদিন বহুবছর যায় চলে যায়
দু’টো সন্তান আর একটি স্বামীর
চৌকাঠ পেরিয়ে
আসে না তোমার চিঠি আসে না

নামাতাগুলো পাল্টে গেছে

নিখিল আকাশের নিচে
নিজেদের কান ধরে বসে আছে
নীলে উজ্জ্বল একদল বানর
পাশেই হেঁটে যাচ্ছে
অভিশপ্ত নদীর নেংটা শিশু
কালো-কালো শিয়ালের দাঁতের করাতে
কেটে টুকরো-টুকরো হচ্ছে সহস্র বর্ষী নক্ষত্ররা।
নামাতাগুলো পাল্টে গেছে
গণিত কেবলই যেন
গণিকার পুরুষ গণনা
অসুস্থ বানরের ভুল সঙ্গীতে
ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ উঠবে মৃত্যুর হাঁটে
ইতিহাসে তা লেখা ছিলো না।

ভাঙন

আমার অশ্রু রঙ
তোমার নিঃশব্দ পায়ের মতোন
সমস্ত ধ্বংস নিয়ে ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়।

আমার মৌনতা
তোমার ছন্দ ভাঙা চিৎকারের মতোন
ছিঁড়ে পড়া কুঁড়ির বেদনার মতোন।

আমার স্বপ্ন সুখ
তোমার যত্নে রাখা টিস্যুর মতোন
দিনশেষে ধুয়ে ফেলা মেকাপে ভেসে যায়।

আমি বসে থাকা বিসর্গ বুড়ি
আমার যোগ বিয়োগ উনিশ কুঁড়ি
উলম্ব দুঃখ সয়ে সবসময় সমান্তরাল।

শোষণের চেয়ে বড়ো কোন ধর্ম নেই

মসজিদ ও মন্দিরের সামনে
বসে থাকে ক’টি সাদা লাল কুকুর
সূর্য ডুবার সময় এরা ঘেউ ঘেউ করে
সেদিন হলুদ সন্ধ্যায়
সীসার মতো জ্বলজ্বল করছে
কুকুরগুলোর জ্বলন্ত চোখ
তীরের সুক্ষ্ম ফলার মতো দাঁড়িয়ে গেছে তাদের অনুভূতি পূর্ণ লোমগুলো
এবং হিংস্র হয়ে তেড়ে আসছে আমার দিকে।

প্রাণ পকেটে ভরে দিলাম জীবনের দৌড়
কুকুর দৌড়ায় আমি দৌড়াই
আকাশ দৌড়ায় গাছ দৌড়ায়
দৌড়াতে দৌড়াতে সামনে দাঁড়ায়
কোটি বছরের তৃষ্ণা
আমি পিপাসার্ত কাক হয়ে দৌড়ে উঠি
এক বেশ্যার বাড়িতে।

সেখানে দেখি মসজিদ মন্দিরের অর্থগুলো
চুষে চুষে খাচ্ছে একদল বানর
পায়ের তলায় মানুষ পিষতে পিষতে
উন্মাদ হয়ে নাচছে কতগুলো সাদা ভাল্লুক
বেশ্যার ঘর থেকে ভেসে আসছে
অনাদিকালের আবহ সঙ্গীত
শোষণের চেয়ে বড়ো কোন ধর্ম নেই।

অপেক্ষা

তুমি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখো
সেখানে তোমার চিহ্ন পাবে না
আবহমান শূন্যতার চিঠি কেবলই শোনায়
মেঘেদের কল্লোল কোলাহল
তুমি তাকিয়ে দেখো সমুদ্রের দিকে
সে উঠে আসে পৃথিবীর দুঃখ থেকে
কেমন বেদনায় সে
অনন্ত কাল চিৎকার করছে আঁচড়ে পড়ছে
তোমার নির্লজ্জ পায়ের কাছে।
তুমি তাকিয়ে দেখো উঁচু অনেক উঁচু
পাহাড়ের উপরে
কেমন নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে আছে জোড়া বৃক্ষ
বহুকাল বহুপথ বহুবছর ধরে ।

ডাক দিয়ে যাই শুক্রবারে

দুঃখগুলো জমিয়ে রাখি সুক্ষ্ম তারে
দুঃখগুলো গুছিয়ে রাখি দুঃখ বাড়ে।
এই যে দুঃখ সোনার দুঃখ শেষ হবে না
মদন মাসির আকাশ হবে দেশ হবে না।
ডাক দিয়ে যাই শুক্রবারে দুঃখ খুলো
দুঃখ নদী ঘুমিয়ে গেছে দুঃখ ভুলো
তোমার তখন দুঃখের মতো নাচতে তারা
দুঃখ আমার দুঃখের মতো বাঁচতে পারা।

আজকাল খুব ভয় হয়

কয়েকদিন ধরে বারান্দায় বসে থাকে
দু’টো অচেনা পাখি
সকালে শিয়রে শেকল লাগিয়ে
টেনে বের করে আনে রাস্তার মাথায়
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি
পাখিদের চুঞ্চিত ঠোঁটের আঁধারে
দাউদাউ জ্বলছে আগ্নেয়গিরি
আজকাল খুব ভয় হয় আমার
পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্য যখন কথা কয়
মানুষেরা তখন ভুলে যায় পথ ভুলে যায় বাড়ি।

অচেনা
দালান জাহান

সকালে সে আমাকে বিক্রি করে দেয়
সবজির দোকানে
বিকেলে বিক্রি করে দেয় শপিং মলে
সন্ধ্যায় তুলে দেয় জীবনঘাতি
এক রাক্ষসের মুখে
গতিসূত্র অতিক্রম করে আমি হারিয়ে যাই
পৃথিবীর পাকস্থলীতে।
রাতে একটা অন্ধকার তুলি দিয়ে
আমার মুখ রাঙিয়ে দেয় সে রাত্রির রঙে
আমি কাঁদতে কাঁদতে জন্ম নেই আবার
মস্তিষ্কহীন মানুষের ঘরে-দুয়ারে।
পৃথিবীর সব পথ হেঁটে হেঁটে উপস্থিত হই আলো এবং অন্ধকারের সঙ্গম স্থলে
যেখানে বেদনার শাড়ি পড়ে দাঁড়িয়ে থাকে
আমার জন্মান্ধ শিশু
এ-ই তুলি রঙ সবকিছু তার চির চেনা
শুধু নিজের আয়নায় নিজেকে দেখি
আমার কাছে আমি কতো অচেনা।

Poet Dalan jahans poem

বাবা ও একটি জলপাই রঙের শার্ট
দালান জাহান

চোখের সামনেই একদল তেলাপোকা
কথায় বেঁধে বাবাকে নিয়ে যায় বনের ভেতরে
আমি বাতাসের মতো নগ্ন হয়ে বাবাকে খুঁজি আকাশে-পাতালে বনে-জঙ্গলে
ঈশ্বরের অলৌকিক আয়নায় মস্তিষ্ক খুঁড়ে
তামাম দুনিয়া তন্নতন্ন করে
তবুও কোথাও তারে দেখা যায় না।
কিন্তু এখনো বাবার ছবিটা
দেয়াল ধরে ধরে হয় বিছানার লাশ
আমি হাঁটু গেড়ে দেখি তার অন্তর ইতিহাস
আগুন-আগুন উচ্চারণ বিক্ষুব্ধ চিৎকারে
কী রকম ভারী হয় অবিস্ফোরিত ধ্বনিবৃষ্টি
আমার চোখ ডুবে যায় পৃথিবীর অন্ধকারে।
ক্ষোভে উত্তপ্ত ইঁটগুলো হাঁটতে হাঁটতে
গ্রেনেড হয়ে দাঁড়ায় হাতের তালুতে
কিন্তু আমি দাঁড়াতে পারি না
জননী আমাকে একটিই যুদ্ধের জন্য
আজীবন ধরে প্রস্তুত করে
বাবার দেওয়া জলপাই রঙের শার্ট
সবসময় টানানো থাকে বুকের হেঙ্গারে।

একদিন শোক উৎসবে পরিণিত হবে
দালান জাহান

একদিন এ-ই শোক
উৎসবে পরিনত হবে
পাথরের প্রাচীর ভেঙে
অঙ্কুরিত হবে মানুষের চারা
একদিন সামনে এসে বসে থাকবে
শতাব্দী আগে মারা গেছে যারা
এমনই করে আমাদের পা
আমাদের ছেড়ে বহুদূর
বহুপথ হেটে আসবে।
বাঁচার মতো কষ্ট ছেড়ে
একদিন সবাই মৃত্যুর মতো আনন্দ চাইবে
খাবারের মতো বিলাসিতা ভুলে
গামলা-গামলা বাতাস খাইবে
অর্থের মতো প্রাচুর্য ছেড়ে
দরিদ্রদের মতো দীনতা চাইবে
সেদিনও দুটি পক্ষ পৃথিবীর পথে পথে
বিপরীতে হেঁটে যাবে হেঁটে যাবে।
একদিন এ-ই শোক উৎসবে পরিণত হবে।

কোন কালেই ঘর ছিলো না
দালান জাহান

কোন কালেই ঘর ছিলো না
ঘর ছিলো না হৃদয় তলে
এ-ই দেখে যাও বুকে কেমন
আগুন ছাড়া আগুন জ্বলে।

চাইছি যারে খুব করে খুব
সেই ভেঙেছে স্বপ্ন চূড়া
বন্য হয়ে হারিয়ে গেছে
অন্ধকারে ফুলের তোড়া।

আজও পাখি ডাক দিয়ে যায়
দূরে কোথাও আকাশ-মলে
পাহাড় ছোঁয়া দুঃখ বরফ
এক নিমিষেই যায় যে গলে।

কিন্তু আজও মন পড়ে রয়
শুক্রবারে শুকনো জলে
এই দেখে যাও বুকে আমার
আগুন ছাড়া আগুন জ্বলে।

সত্যি বলছি শব্দ নীল
দালান জাহান

আমি মিনারের পায়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম
আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম সমস্ত আকাশে
একদিন আমাকে নিয়ে উধাও হয়ে যায়
বেদনাক্লান্ত এক বিক্ষুব্ধ চিল
সেদিন থেকে আমি আর আকাশ দেখি না
দেখি না মন ময়ুরের মাখন রাঙা তিল
সত্যি বলছি আমি সত্যি বলছি শব্দনীল।

হুয়াংহু নদীর দুঃখ
দালান জাহান

বারান্দায় মৃতদেহ পড়ে আছে
গ্লাসের চাকায় আটকে আছে পৃথিবীর ঠোঁট
তবুও কেউ কেউ অতি বেদনায়
জমা দিয়ে যায় জীবনের ভোট।

পশ্চিমে নাচে সাদা ভাল্লুক
উত্তরে বিষম বরফ কাঁদে
দক্ষিণে এই একই আঁধার
হুয়াংহুর দুঃখ যে আজ সবার কাঁধে।

অচেনা গণিত
দালান জাহান

সময়ের যোগফল ধরে অঙ্ক কষেন গণি মশাই
মনে করো পাঁচ টাকা আলুতে দশ টাকা তিলে
বলি গণি মশাই ও গণি মশাই
এমন মনে করে কী জীবনের অঙ্কটা মিলে?

গণি মশাই হেসে বলেন
পদার্থ বিজ্ঞান গণিত ধরনীর যা কিছু বলেন
সবকিছু অনুমান পারফেক্ট কোন কিছু নয়
ধরে বেঁধে হিসাব শুধু করে যেতে হয়।

কিন্তু মশাই
আমার তো আর কোনদিকে হিসেব মিলে না
এতো ধরে এতো করে রেখেছি যারে
সে এমন অচেনা গণিত
পৃথিবী তার পাঠ জানে না।

জানালায় আল্পনা নেই
দালান জাহান

হৃদয় খুঁড়ে তুলে আনি স্নিগ্ধ পাথর
যে কিনা আমার দিকে তাকিয়ে
অনন্তকাল হাসতে থাকে
এমন নিষ্ঠুর হাসি পাষাণেও হাসে না।
কান্নার জামা ছিঁড়ে খসে পড়ে লাশ
না লেখা শব্দের অতীতে ভেসে যায় নদী।
দু’হাতে ভর করে আসে মৌন মহারাণী
অবাক চোখে তাকিয়ে দেখি
সন্ধ্যার স্তনে মৃত্যুর দাবি নিয়ে উড়ছে
সাদা শকুনের কারুকার্য চুল
সকালের ডাহুক সন্ধ্যায় বলে যায়
আমাদের জানালায় আলো-আল্পনা নেই
নেই কোন সাধারণ ভুল।

Poet Dalan jahans poem

নিতাই
দালান জাহান

আজও আমার চোখে সেই অশ্রুনদী
আজও আমার বুকে সেই না জ্বলা আগুন
আজও একান্তে বয়ে যাই সেই পবিত্র ক্ষত
আজও নিজের ব্যথায় নিজেকেই করি খুন।

আজও শুনি সেই কান্নার বাঁশি
কষ্টের জপমালায় মরি আরও শতো
তবুও তোমাকে জিজ্ঞেস করি নিতাই
এভাবে আর কষ্ট দিবে কতো।?

নীরবতা
দালান জাহান

যদি সব নীরবতা সম্মুখে ছেড়ে দেই
প্রাগৈতিহাসিক বন্যায় ভেসে যাবে মেয়ে
নীরবতা শুধু সত্য অথবা শক্তি নয়
নীরব তো মহানরাই হয়
অইযে নীরব ধরনীর চাষি
গোপনে পুড়িয়ে নিজের কঙ্কাল
যেমন নীরব পৃথিবী নিয়ে
তোমার মুখোমুখি বসি।

দেখা হবে না
দালান জাহান

একশো বছর বেঁচে থাকলেও
দেখা হবে না
তোমার বাড়ির সামনে দিয়ে
হেঁটে গেলেও রোজ দেখা হবে না
হাজার দেখায় মিলিয়ে যাবে
অদেখার ভ্রমর কালো চোখ
অবিশ্বাসের বর্ণমালায় ঢুকে যাবে সমস্ত আকাশ
নিঃসঙ্গ বালুচরের বাড়বে শুধু মরিচীকা
আসলে যা আসল কিছু না
দেখা হওয়ার দৃশ্যটা মিলিয়ে যাবে অদেখায়
যে খবর মেঘ জানে সে খবর বৃষ্টি জানে না
একশো বছর বেঁচে থাকলেও
দেখা হবে না দেখা হবে না।

তবুও এগিয়ে আসব প্রভুভক্ত কুকুর
ডালের তেলে তেজ পাতায় ছড়াব
মেথি দানার সুস্বাদু ঘ্রাণ
শাকের পাতে শুকনো মরিচের ঝাল
তোমার নলকূপ কেটে বের করব
দুফোঁটা সোনার দাম
জল হয়ে ছুঁয়ে যাবো জল
যে জল বাড়ায় শুধু অতীত যাতনা
একশো বছর বেঁচে থাকলেও
দেখা হবেনা দেখা হবে না।

ভবিষ্যত মেয়ে
দালান জাহান

পলাশী থেকে একাত্তরে
বুকের ভেতর ঝড় তোলা বৈশাখী মেয়ে
ওপারে কাশবন পোড়ে গেছে ছাই হয়ে
তবুও কী দেখিস অপলক চেয়ে?
যাবেই যদি যা
আমার ভেতরে বাবার মতো গাছ
মনের করাতে কেটে নিয়ে যা
আমি তোর হাতেই তুলে দিবো
ভাবনা ছাড়া -ভবিষ্যত।

অন্ধকারের জননী
দালান জাহান

পৃথিবীর অদূরে এক মহাদেশ ছিলো। তারা ছিলো সবদিক থেকে উন্নত এবং জ্ঞানী। তারা তাদের প্রজ্ঞা এবং জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে এমন জায়গায় পৌঁছালো যে, কোথাও যেতে চাইলে তারা শুধু মনস্থির করতো। সাথে সাথে তারা সেখানে চলে যেতো। তাদের এই গতির নাম ছিলো মন গতি। এই গতি শক্তি আয়ত্ত করতে গিয়ে তাদের গড়ে আয়ু নেমে আসলো পঁচিশে কিন্তু তাতেও তারা সন্তুষ্ট ছিলো।

কারন এই পঁচিশ বছরে তারা আকাশ-পাতাল সব দেখে নিতে পারতেন। সেকারণেই তারা পৃথিবীর অন্যসব মানুষ থেকে আলাদা হয়ে পড়লো যেন কেউ তাদের জানতে না পারে এবং তাদের এই রুহু বিদ্যার কৌশলও যেন কেউ আয়ত্ত করতে না পারে। তারা তাদের এই গতি শক্তি নিয়ে যে কোন গ্রহ নক্ষত্র ঘুরে বেড়াতো। এবং তারা এটুকু নিশ্চিত হয়ে ছিলো যে আগামী একশো বছরের মধ্যে তারা মৃত্যুকে জয় করতে পারবে।

কিন্তু তাদের শিক্ষাগুরু মৃত্যুর আগে বলে গিয়েছিলেন সব গ্রহ নক্ষত্রে যাওয়া যাবে কিন্তু সূর্যের পশ্চিমে একটি অন্ধকার গ্রহ আছে যার নাম “পরমা” সেখানে যাওয়া যাবে না। কথিত আছে এই পরমা ছিলো এক অলোকসুন্দরী গ্রহ। যাকে দেখে সমস্ত গ্রহের বীর্যস্খলন হতো। কিন্তু পরমা ভালোবাসতো
হাজার বছরের দূরত্বে অবস্থান করা এক সিংহগ্রহকে। যা সূর্য মেনে নিতে পারতো না। একদিন সূর্য পরমাকে তার উত্তাপ দিয়ে ঢেকে ধর্ষণ করলো। সূর্যের বীর্য পরমার শরীরে ঢুকার সাথে সাথে পরমা কৃষ্ণাঙ্গ হয়ে গেলো। পরমার শরীর পোড়ে কালো হয়ে গেলো। সেই থেকে পরমা সূর্যকে অভিশাপ দিতে দিতে পরিগনিত হলো অভিশপ্ত গ্রহে এবং পরিনিত হলো অন্ধকারের জননী বা উৎপত্তিস্থল হিসেবে । সমস্ত রোগ শোক বিপদ ঝড় এখান থেকেই উৎপন্ন হয়ে মহাবিশ্বে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু তাদের একদল অভয় এবং অবাধ্য যুবক অভিশপ্ত গ্রহে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো।

সকলের অগোচরে তারা চলেও গেলো সেই অভিশপ্ত গ্রহে। কিন্তু তারা ফিরে আসার পর সমস্ত মানুষেরা মরতে শুরু করলো। কেউ এর উৎপত্তি কারণ নির্ণয় করতে না পারলেও তাদের বর্তমান শিক্ষাগুরু অনুমান করতে পেরেছিলন। বাঁচার রাস্তা হিসেবে আদেশ এলো অন্ধকার গ্রহ থেকে ঘুরে আসা সবাইকে হত্যা করতে হবে। সে অনুসারে এদের সবাইকে রাতের অন্ধকারে হত্যা করা হলেও একজন পালিয়ে দূরবর্তী এলাকায় আশ্রয় নিলো। যখন এলাকার মানুষ টের পেলো তখন তাদের মধ্যে মৃত্যু শুরু হয়ে গেছে। এভাবে তাদের পুরো এলাকা ছড়িয়ে গেলো।

এরপর তাদের শিক্ষাগুরু সবাইকে ডেকে বললেন এ থেকে বাঁচার একটাই উপায় আর তা হলো মৃত্যুকে ভয় দেখাতে হবে যদি মৃত্যু ভয় পায় এবং পালিয়ে যায় তখনই আমরা বাঁচতে পারব। শুধুমাত্র মৃত্যুকে ভয় দেখানোর জন্য তারা নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও একে অপরকে আলিঙ্গন করা শুরু করে দিলেন।

Poet Dalan jahans poem

এখানে মৃতদেহ আছে
দালান জাহান

এখানে এক মৃতদেহ আছে
এখানে আছে এ-কঙ্কাল
রোদের মতো অভেদ রাগে
পুড়িয়ে যায় পৃথিবীর গাল
এখানে এক মৃতদেহ আছে
এখানে আছে এ-কঙ্কাল।

এখানে এক জরাগ্রস্ত নারী
এখানে এক তামাটে কাল
এখানে এক দুঃখগ্রস্ত নদী
নিজেই ভাঙে নিজের ডাল
এখানে এক মৃতদেহ আছে
এখানে আছে এ-কঙ্কাল।

অভিযোগ
দালান জাহান

আমারে কে আর বুঝে কে খুঁজে এ মন
আমি তো মরেছি কবে ধোঁয়ার সঙ্গীতে
হারিয়ে বুকের মালা সুপ্ত গুপ্তধন
বলেছি বিপ্লবী আমি বিজয়ী ভঙ্গিতে
ঝুলিয়েছে পৃথিবীর স্মৃতি অনুরণ!
সব দুঃখ নিয়ে থাকি চুপ শান্ত পাখি
আমার ভেতরে শুধু আমারেই দেখি
আমারেই আমি করি রোজ চিত্তে বরণ।

যে হতে পারতো নাম নিয়তি বা রাণী
সে পেয়েছে পর ঘর অন্ধকার সীমা
হয়েছে শত্রুর মতো চারপায়ে প্রাণী
আমি তো করেছি তারে নিরঙ্কুশ ক্ষমা
সাজিয়ে রেখেছি রূপ-কূপ ফুলদানি
মিনতির ঋণে শুধু অভিযোগ জমা।

ঈশ্বরলিপি
দালান জাহান

অন্ধকারের উৎস লিখতে তার ঘরে যাই
সে হাতে তুলে দেয় দুটো সাদা সন্দেশ
তখন আমি কাকে লিখব! বুঝতে পারি না
লিখতে যাই দুটো বৃক্ষের নাম
সে ঈশ্বর-ঈশ্বর বলে ঢুকে যায়
আমার কলমের ভেতর
আমিও কেমন জরাগ্রস্ত বাছুরেরও মতোন
হাম্বা হাম্বা করি লিখে ফেলি ঈশ্বর
এভাবেই দিনে দিনে আমরা ঈশ্বরকে ঈশ্বরের চেয়ে বড়ো করে ফেলি।

Poet Dalan jahans poem

মঙ্গলীয় সাপ
দালান জাহান

হাজার মহাদেশ পাড়ি দিয়ে
দরজায় দাঁড়িয়েছে এক মঙ্গলীয় সাপ
তার ঠোঁটের ধারে চিরতরে মুছে যাচ্ছে
হাজুর বাপের শতবর্ষী বসন্তে দাগ
প্লেগের মহামারীও নতজানু হয়ে
নিজের চিহ্ন মুছেছে পশ্চিম মহাসাগরে।

যন্ত্রণায় গদগদ আমাদের ঘাসগুলো
তবুও যুবক হচ্ছে দুপুরের সূর্যের মতো
সমস্ত ভূমি সাপের জিভে ঢেলে দিয়ে
এতিম অশ্রু ছাড়ছে
ঈশ্বরের মতো নীরব মালকিন।
আকাশে উড়ছে কম্বলের মতো ভারী
আদমের মতো বড় সার্টিফিকেট
সবার চোখের সামনে হেঁটে হাসছে
বহুপ্রতীক্ষিত কর্পূর পাহাড়
কিন্তু এ কথা কেউ বলছে না
তাকে ধরার জন্যই
আমরা দাঁড়িয়ে আছি অনন্তকাল।

ধর্মের ধোঁয়া
দালান জাহান

কেবলই একটি যুদ্ধের দাবিতে
সিসার বাতাসে ঝঙ্কার তুলেছে অন্ধকার
সমস্ত দুঃখভোগ জড়িত হচ্ছে
পৃথিবীর চেয়ে উঁচু পাহাড় চূড়ায় ।

অলৌকিক অহঙ্কারে পুড়ছে
ফোঁটা ফোঁটা কান্নার কুঁড়ি
ধরণীর ধমণীতে ছড়িয়ে যাচ্ছে
ধর্ষিত ধর্মের দমদম ধোঁয়া।

খণ্ড বিখণ্ড বিশ্বাসে
বিপন্ন মহাদেশগুলো গৌরবে হেঁটে যাচ্ছে
আমাদের মৃত্যুর উপর।

তিন অক্ষরের অন্ধ আগুন
দালান জাহান

আশ্চর্যজনকভাবে পুড়ে যাচ্ছে
আমাদের আকাশ, আমরা মরে যাচ্ছি
তিনটি অক্ষরের অন্ধ আগুনে
অথচ বিশ্বের ঈশ্বরেরা
এখনও ঘুমিয়ে আছেন আশ্চর্যজনকভাবে।

আশ্চর্যজনকভাবে দাঁড়িয়ে আছেন
সাত আসমান এবং ফেরেশতা কোল
তারা দাঁত মাজতে গিয়ে
ভেঙে ফেলছেন বৃক্ষদের বোবা সংসার
তারা হাত ধুতে গিয়ে ধুয়ে ফেলছেন
পৃথিবীর পাকস্থলী।

যখন তাদের কাছে আমরা মুক্তি চেয়েছি
তখন তারা আমাদের বন্দি করেছেন
যখন তাদের কাছে শৃঙ্খল চেয়েছি
তখন তারা আমাদের ছেড়ে দিয়েছেন
স্রোতে ভাসানো মাছের ডিমের মতো
আমরা ভেসে যাচ্ছি ফেঁসে যাচ্ছি।

বেঁচে আছি কল্পনায়
দালান জাহান

শুধু তোমার ভয়ে একশো বছর
এই শহরে নেই আমি
শুধু তোমার ভয়ে একটা জীবন
পালিয়ে বেড়াই আমি
তবুও শতরূপে শতবার
সামনে দাঁড়াও তুমি
আমি কোথায় যাবো
সমস্ত পৃথিবী ছুঁয়ে গেছে
তোমার আল্পনা
তবে কী আমার বেঁচে থাকাটা
শুধুই কল্পনা।

মানুষের নাম লিখে দাও
দালান জাহান

ওখানে আমার নাম লিখে দাও
যেখানে টুপটুপ গড়িয়ে পড়ে
স্বরবর্ণের ক্ষুধার শরবত।
সকাল পেরিয়ে সন্ধ্যা হলেই
সমুদ্রের মতো যুবতী হয় মৃত্যু।
উপসর্গ নামক স্বীকৃতি সার্টিফিকেট
ধুলোয় অচল ক্যালেন্ডারের পাতা
বেওয়ারিশ মানুষের মতো অবাঞ্ছিত লাশ।

ওখানে আমার নাম লিখে দাও
যেখানে জমে উঠেছে কষ্টের কফ
নিউমোনিয়া ঠাণ্ডা স্রোতে
প্রোথিত পথ সাধারণ ভবিষ্যত।
ওখানে মানুষের নাম লিখে দাও
যে আতঙ্ক ঘামে ভিজে যায়
মা মাটি ও সপ্তবর্ণা পৃথিবীর স্তন।

Poet Dalan jahans poem

লুকিয়ে দেখি
দালান জাহান

লুকিয়ে দেখি কেমন করে
সেই পাহাড় হেঁটে যায়
যার চোখের ভেতরে জমা
হাজার মৃত শুক্রবার
লুকিয়ে দেখি কেমন করে
ধরে অগ্নি দাবানল
বাতাসেরই মতোন হুহু কান্না
নিয়ে কোথায় চলে যায়।

লুকিয়ে দেখি শামুক মুখ
হৃদয় ছোঁয়া পৃথিবীরে
লুকিয়ে দেখি আরও দূরে
দূরের সেই মানুষেরে
যাকে দেখেই বুঝেছি মায়া
মানুষ মন পৃথিবী সম
কুয়াশায় হাঁটে পথ।

করোনা কালের সনেট

দুঃখ মানুষ
দালান জাহান

কি নামে ডাকলে পড়ে সারা দিবে তুমি
মরে গেছে নদী আজ মরে গেছে দেশ
হাঁক ছাড়ে বুনো হাঁস লজ্জায় অশেষ
নয়নের সম্মুখেযে শুধুই পোড়া ভূমি
তুমি কী বুঝ না কান্না অশ্রু ধারা জল
বইছে বাতাস চিঁড়ে জগত সীমানা
এইকি প্রেম তোমার এইকি নমুনা ?।
এ কেমন ভগ্নদশা অশ্রু ধবল।

এমন ব্যথা অতল পথে পথে বাসা
এমন দুঃখ মানুষ জানে না ধরণী
রক্তঝরা দিনে নেই এতো হাহাকার
যতোটা ছুঁয়েছে এই মৃত্যু সর্বনাশা
মুছে গেছে দাগ আজ আড্ডার সরণী
কেঁদেছে পৃথিবী মুখ তুলে কতোবার।

নদীরা জেগে উঠে না
দালান জাহান

নদীরা ফুলের মতোন
বদ বাতাসে ওড়ে ওড়ে যায়
নদীরা বিলবোর্ডের বিজ্ঞাপনের মতোন
কাগজের কার্তুজে কেটে যায়
নদীদের মাংসের দুয়ার।
একমাত্র নদীরাই পূজো করে
তিনখণ্ড প্রেতছায়ার
এবং চিরকাল ঘুমিয়ে থাকে
মিথ্যে এক ওমের ভেতর।

জন্ম থেকে শুনে আসছি
নদীরা জেগে উঠবে নদীরা জেগে উঠবে
চর পড়ে পলি পড়ে স্ফীত হয়
নদীর সবুজ শিশু
তাবু টানিয়ে বর্ষণে যায়
তিনবার জেলখাটা হীরণ মেম্বার
কাশবনের সব খবর না-কি গোপন থাকে
আকাশে অথবা কাগজে আসে না
সহস্র বছর যায় চলে যায়
নদীরা জেগে উঠে না নদীরা জেগে উঠে না।

Poet Dalan jahans poem

শিরোনামহীন কবিতাগুচ্ছ
দালান জাহান

১.

আগে সকালে রুটি খেতাম
এখন মধ্যরাতে খাই একজগ ভয়
তারপর ষাঁড়ের মতো দৌড়াতে থাকি
পুরাতন প্রেমিকার বাড়ির দিকে
একমাত্র সেই জানে মৃত্যুর পর
জন্মদাগ গুলো কোথায় থাকে
সে যে কতো বড়ো করোনা
আমি ছাড়া তা জানে না লোকে।

২.

আমি স্বীকার করছি
তোমাকে ভালোবাসতাম নতশিরে
আমি স্বীকার করছি
শুধু তোমার সারা পাওয়ার জন্য
দাঁড়িয়ে থাকতাম গলির মোড়ে
আমি স্বীকার করছি কোনদিকে
হেঁটে গেছে বিনয় বৃষ্টিধারা
অথচ তুমি স্বীকার করছো না মেয়ে
শাশ্বত কাল ধরে তুমি কার জন্যে খাঁড়া।

রাত হলেই ভেসে আসতো
সেই রবীন্দ্র সঙ্গীত
যে সুরের কোমল তলে
আরেকটা বনলতা সেন খুঁজতে খুঁজতে
হয়ে যেতাম জীবনানন্দ দাশ।
সে সঙ্গীত এখনও বাস করে
আমার ঘরের ছোট বনসাইয়ে
সে সঙ্গীত এখনও ঘুরে বেড়ায়
আমার রক্তে রক্তে
সে সঙ্গীত এখনও গায়ের চাদর
সে সঙ্গীত এখনও অন্য আদর।

মনে রাখি তারে
দালান জাহান

আমি মনে রাখি তারে
যেমন মনে রাখি তার বুকের সুগন্ধি আতর
আমি মনে রাখি তারে
যেমন মনে রাখি সে মরুর মতো তৃষ্ণা কাতর
আমি মনে রাখি তারে
যেমন মনে রাখি তার, জল ও জীবনের সোঁদা
আমি মনে রাখি তারে
যেমন মনে রাখি ভালোবাসা ও ভয়ে ভরা খোদা
আমি মনে রাখি তারে
যেমন মনে রাখি পাখি নদী ও বাউলের তান
আমি মনে রাখি তারে
যেমন মনে রাখে মা জঠরে ধরা স্বীয় সন্তান।

নদী ও মেয়ে
দালান জাহান

দুটো ঘর অতিক্রম করে
নদীটি মেয়ে হয়ে যায়
সকালে সে জল দোলায়
বিকেলে ভাঁপ নেয় আদমের।
গ্রাম শহরের পর মহল্লার দেহাতিরা
বন্দিত্বের শেকল নিয়ে আসে
পাখির মতো কলকল মেয়েটি
ভর-দুপুর আঁচল তুলে হাসে।
উপমার চেয়ে যুবতী সঙ্গীত
অতীত শব্দের অভিজ্ঞতায়
জেগে উঠে আগ্নেয়গিরির মতো
আমিও মানুষ পাপের পাথর
পেটে ক্ষুধা টেবিলে ভাত
সইবো আর কতো!

ঢেউয়ের নদী
দালান জাহান

আবার যদি জীবন মিলে দুঃখ দানে
আবার যদি হয়রে কথা বাঁশি বাজে
আবার যদি যাইরে মরে প্রেম লাজে
প্রান বাড়িয়ে প্রিয়ো মিশে যেয়ো প্রাণে।
যাওয়া আসার পথ ভুলে হই যদি
তোমার ঘরের ছায়া ছোট তালা চাবি
মনে রেখো স্মৃতি তুমি মনে রেখো দাবি
নির্বাসনে ঢেলে দিও ঢেউয়ের নদী।

হয়তো আমি চিনতে পারি নামা-নারী
হয়তো আমি ডাকতে পারি নাম ধরে
হয়তো আমি ভাসতে পারি আঁখি জলে
ঘুমের ঘুরে খুলতে পারি নব বাড়ি
হৃদয় দিয়ে ডাকতে পারি দূরে দূরে
কেমন করে বুঝবে এতো নত হলে।

নীলপদ্ম
দালান জাহান

আজ এই প্রথম অপ্রস্তুত মুখটি
সকাল হতে খেলা করছে
আঙিনায় লাল কাঞ্চন জবা
হাতির শুঁড়ের মতো বের করছে
একশো বছরের সমবেদনা
তুমি কী জানো! তুমি ছাড়া
কী রকম রকম এতিম আমি
যে ফুলটি বুকে রাখি
সে ফুলটি চোখে রাখি না
ময়ূর নিদ্রায় ভেসে যায় নীলপদ্ম
কতোদিন! কতোদিন! প্রিয়
মাথা উঁচু করে আকাশ দেখি না।

পঙ্গপাল
দালান জাহান

অচেনা রূপে হৃদয়ে নামে চেনা পঙ্গপাল
তাদের দু’হাতে সজ্জিত রক্তিম পাহাড়
অগভীর মৃত্যু ডিঙিয়ে
তারা তুলে আনে সভ্যতার সেরা পিরামিড
করুণার সবুজ সমুদ্র কেটে
তারা ভাগ করে দেয় বিবর্ণ বেদনার খাল।

তবে কী মানুষ আজও চিনেনি
অন্ধকারের অতি-অতিথিদের
তবে কী মানুষ আজও চিনেনি
দ্বিখণ্ডিত জিহ্বার ছায়া
চিনেনি নিজ রমণীর কাঁচাপাকা চুল
রোজকার উনুনের আগুন
বুকের ভেতরে কবর দেওয়া মৃতদেহদের?

পঙ্গপাল হাইরে পঙ্গপাল
সোনার দেশের আনাচে-কানাচে
আমার মাংস খেয়ে বেঁচে থাক তোরা
এখনো বহুদূর জীবনের নদী
অকালে আর জল ভাঙিস না
জালের উপর জাল পাতিস না।

Poet Dalan jahans poem

আমার খোকা গোপনে কাঁদে
দালান জাহান

তুমি আমার কান্না লুকিয়ে রাখো
তোমার স্যুটকেস ভর্তি সাদা কাগজে
তুমি আমার কান্না লুকিয়ে রাখো
তোমার স্ত্রীর গলায় কানে ধবধবে স্তনে।
আমার একটু একটু আত্মা নিয়ে
তুমি জন্মদিনে খরগোশ উপহার দাও
তোমার আত্মজাকে
তোমার খোকা হাইব্রিড আনন্দে
জিরাফের মতো লাফিয়ে উঠে
কিন্তু আমার খোকা
অনুচ্চারিত দুঃখ নিয়ে
গোপনে কাঁদে আমার বুকে।

শৃঙ্খল
দালান জাহান

চূর্ণ-বিচূর্ণ ইটের আত্মায়
বাজে যে অন্ধের গান আমি সেই অন্ধ
আমি জন্মেছি সেই অন্ধকারে।
কারখানার কালো ধোঁয়ায়
নগরে নগরে মিশে যায় যে দীর্ঘ অভিশাপ
আমি জন্মেছি সেই অভিশাপ থেকে।
যে শিকলে বাঁধা মহাকাশ পথ
পৃথিবীর মেরুদণ্ড
আমি জন্মেছি সেই মেরুদণ্ড থেকে।

আমাকে তুমি সবখানেই পাবে
তোমার ঘরে-বাহিরে
আমার আবেগে আগুন প্রলয়ঙ্কারী ঝড়
আমি মৃত্যুহীন মৃত্তিকার মতো ঘর
দোয়েলের মতো ছটফটে আমার নিঃশ্বাস
লাগাম ছাড়া ঘোড়ায় নাচে
আমার বিস্ময় সংক্রামিত শব্দদল
যে শৃঙ্খলে সৃষ্টি থেকে নিরাকার ঈশ্বর
আমি শৃঙ্খলিত সেই শৃঙ্খল।

চেনা-অচেনা
দালান জাহান

তাকে চিনেছি মৃত্যু ভিড়ে ভিড়ে
তাকে চিনেছি রক্তে স্রোতধারায়
তাকে চিনেছি গহীন কালো অন্ধকারে
তাকে চিনেছি দুঃখে দুর্দিনে মৃত্যু ছায়ায়
তাকে চিনেছি ঘরে ঘরে দুয়ারে দুয়ারে
তাকে চিনেছি নয়ন ভেজা
মানুষের অলিতে-গলিতে
তাকে চিনতে চিনতে এখন
নিজেকে আর চিনতে পারি না।

মেঘ ময়ূর
দালান জাহান

নৈঃশব্দের শব্দ ডিঙায়
প্রান্তর মাথায় নিয়ে বসে থাকি দিনরাত
আবহমান বাতাসের কলধ্বনিতে
তুলো হয়ে ওড়ে আমার আপন শিশু
মেঘে ময়ূরে ভর করে যায়
বিশ্ববাড়ির উৎসব মেয়ে
যে আমাকে আর কাছে ডাকে না
পূর্ব-পশ্চিমে উত্তরে-দক্ষিণে
ঝরে পড়ে জ্বলন্ত স্মৃতি
আলোহীন ভর দুপুরে
একার চেয়ে একা হয়ে যাই
একান্ত আর কান্না ছাড়া
তখন বিশেষ কেউ থাকে না।

মানুষের ফুল
দালান জাহান

জলাবদ্ধ মাছের ঘের ভেঙে
একদিন ফুটবে মানুষের পাতা
তপ্ত দুপুরে চোখ কচলাতে কচলাতে
চকলেটের দোকান ঘরে নিয়ে যাবে
করম আলীর মৃদুল মেয়েটা।
যদি সেদিন পথ অচেনা হয়
যদি সেদিন সিঁদুর ভেঙে না নেমে আসে
প্রিয়তমার ডাগর কালো চোখ
যদি তার সাথে আর দেখা না হয়
যদি আর কথা না হয় অদেখা প্রেম আমার
সেই রৌদ্র ডানায় লিখে দিও এই খবর
আবার ঘুরছে মানুষের চাকা
নড়ে উঠছে চায়ের স্টলের আড্ডা কেতলি
পৃথিবীর ছাদে আবার ফুটছে মানুষের ফুল
বাতাস আবার চলতে শুরু করেছে
চিন্তিত পাখিরা গান ধরেছে শাখায় শাখায়
ফজল কারীর ফর্সা মেয়েটা
গতরাতে পালিয়ে গেছে অজানা এক ছেলের সাথে।

শিরোনামহীন
কবি আমার আমি

কারও শিরোনাম হতে চাই না
হতে চাই না কারও বেদনার রঙ
যতোটা কষ্ট আছে আমারই থাকুক
সমস্ত দুঃখের দুঃখ নিয়ে
কাঁদুক না হয় আমার পৃথিবী কাঁদুক।

কারো শিরোনাম হতে চাই না
চাইনা হতে সাক্ষী কারো দেয়া শত নির্ভরতার আগুনে কাঁদুক আমার যন্ত্রনা তোমার দেয়া শত উপেক্ষার
গচ্ছিত আমানত হয়ে।

কাঁদুক আমার পৃথিবী কাঁদুক
চাইনা কারো শিরোনাম হতে, হতে চাইনা রাতজাগা অচেনা পাখির মতো অচেনা গন্তব্যের পথভ্রষ্ট পথিক হতে,
চাইনা পেতে খুঁড়ে খাওয়া
দীর্ঘশ্বাসের মাতম জড়িত
অলীক ভালোবাসার হাতছানি!

কারো শিরোনাম হতে চাই না
হতে চাই না কারও বেদনার রঙ
কাঁদুক আমার পৃথিবী কাঁদুক
আপন যন্ত্রণার যুদ্ধ জয়ের গল্পে—!

একলা আকাশ
দালান জাহান

এখানে বড়ো একলা আকাশ
এখানে আর চাঁদ উঠে না
নাকি পারফিউম ঢেলে
মেথর বাড়িটা ডিঙিয়ে যায় সময়
পিঠ বোঝাই নীরবতা নিয়ে
একটু একটু করে এগিয়ে যায়
রায় বাড়ির বুড়ো কচ্ছপ
গত কার্তিকে ভেজা কুকুরটা
লোম ঝাঁকা দিয়ে ঝেরে ফেলে দেয়
আজকের মৃত বেদনা
এখানে বড়ো একলা আকাশ
এখানে আর চাঁদ উঠে না।

Poet Dalan jahans poem

কলঙ্কের আব্বু
দালান জাহান

তাকে হত্যার পর
খুব একটা কিছু করতে পারছি না
এই যেমন হাতের কলম মূহুর্তেই ছুড়ি হয়ে
নিজের বুক চিড়ে লিখে যাচ্ছে
অসমাপ্ত সঙ্গম কাব্য
চলতে গিয়ে উল্টে যাচ্ছি রোলারের মতো
থামতে গিয়ে দৌড়ে যাচ্ছি
দৌড়াতে গিয়ে পারছি না।

যখন আকাশের মতো দীর্ঘ নদী
পত্রিকার শিরোনামে লিখে দিয়েছে
নিজের যতো কলঙ্কের দাগ
তখন বাজারে এতো ডেটল ছিলো না যে
মানুষের মনে পৌঁছে দেব
মুছে দেওয়ার মিথ্যে অসুখ
এরপরও নার্সকে বলে দিয়েছি
আগামীকাল তাকে একটি শিশু উপহার দেব।

কিন্তু আমি হবো কলঙ্কের আব্বু।

সেলাই করার সময়
দালান জাহান

এখনো দেখছি
ডানে-বামে তাকিয়ে
সমুদ্র ও সূর্য দেখে কাঠবিড়ালি
এখনও দেখছি
দুঃখের মতো লম্বা হয় শীতলতা
এখনো দেখছি
নক্ষত্রের পেটে বড়ো হয় নক্ষত্ররা
এখনো দেখছি
জীবন সংসার ফেলে বেদনার অনন্ত বীজ
পান করছে মানবিক মানুষেরা।

অথচ কেউ কেউ এখনো মহাবিদ্যায়
সেলাই করছে নিজেদের
কেউ কেউ ভাবছেন
এটাই বোধহয় সেলাই করার শ্রেষ্ঠ সময়।

অদৃশ্য হয়ে যাওয়া হাত
দালান জাহান

আত্মার ভেতরে কেঁদে ছিলো নারী
তোমরা সে কান্না শুনোনি, তোমরা শুনোনি
নদী নামক শিশুটির মৃত্যু হাহাকার
তোমার ঘরের ছায়ায়
খেলা করে যে অরণ্য আকাশ
যে পথে আজও আমাদের ঘরে
আসা যাওয়া করে বিগত পূর্ব-পুরুষেরা
সে পথে উলঙ্গ হয়ে স্নানে নেমেছিলো
সদ্য শীৎকার তোলা
একদল বর্বর তরুণ-তরুণী
লজ্জায় নিজদের মুখে নিয়ে বসন্ত পথ
কোথায় যেন হারিয়ে গেছে তারা।

তোমরা শুনোনি ধ্বংসস্তূপের নিচে
কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা
ফিলিস্তিনি শিশুদের জগত কান্না
তোমরা শুনোনি বিনা বিচারে নির্যাতিত
হরিণ সাবকের আদালত চিৎকার।
তোমরা শুনোনি অভিমানী মেঘেদের কথা
পূর্ব থেকে পশ্চিমে ভ্রমণে যাওয়ার পথে
গুহায় টেনে নিয়ে বলাৎকারের নামে
যাদেরকে চিরতরে মেরে ফেলে পর্বত।

মাথার উপর থেকে সরে গেছে সেই হাত
যে হাত তুমি সরিয়ে নিয়েছিলে
স্নিগ্ধ শীতল বসন্তের মতো
নরম রমনীর হৃদয় থেকে।
যে হাত তুমি সরিয়ে নিয়েছিলে
বিচারের দাবিতে আত্মাহুতি দেওয়া
সেই ইরানি মেয়েটির সমবেদনা থেকে
যে হাত তুমি সরিয়ে নিয়েছিলো
রোহিঙ্গা শিশুর জ্বলন্ত মিছিলে
যে হাত তুমি সরিয়ে নিয়েছিলে
আফগান মেয়েটির নির্বাক আর্তনাদ থেকে
একটু একটু করে যে হাত তুমি গুটিয়ে নিয়েছিলো
নিজের পকেটের ভেতর
আজ অদৃশ্য হয়ে গেছে সেই হাত।

যখন সবাই কাঁদে তখন কেউ কাঁদে না
সমগ্র বিশ্বে আজ একটিই স্রোত একটিই নদী
একই দুঃখ একই অশ্রু হৃদয় বিদীর্ণ করে বয়ে যায় অথচ তা বুকে বাঁধে না।

সমুদ্র তৃষ্ণা
দালান জাহান

একদিন যে প্রেমজ
কাঁদতে কাঁদতে সমুদ্র হলো
চিরতরে ডুবে গেলো অশ্রুজলে
কার বা এতো সাহস আছে
ভুবনে নয়নে তাহারে বাঁধে
আজও তো কেউ জানে না
কতটা তৃষ্ণায় সমুদ্র কাঁদে।

সংবাদ
দালান জাহান

গতকাল যারা পৃথিবীতে এসেছেন
নারী কাঁটার পরই
তারা দৌড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন
যার যার ধর্মালয়ে।

যে সংবাদটি হত্যা করা হয়েছিলো
ব্রাহ্মণের ঠোঁটের ছুড়িতে
যে সংবাদটি মাংসের ঝুলে মিশিয়ে
লুকিয়ে খেয়েছিলেন বিশ্বস্ত মৌলভী
যে সংবাদটির স্পষ্ট চিৎকার ভাঙতে
টানা তিনদিন গীর্জায় বাজানো হয়েছিলো
বিরক্তির ঘন্টা।

হয়তো সে সংবাদটি বলতেই তারা এসেছেন
হয়তো এসেছেন তারচেয়ে বড়ো কিছু বলতে
কিন্তু আজ ধর্মালয়ে কোন মানুষ নেই
তাহলে কি কোনদিনও
সংবাদটি পৌঁছাবেনা আমাদের কাছে!

Poet Dalan jahans poem

তারা শুধু পূর্ব-পশ্চিম বোঝে
দালান জাহান

মৃত্যু-মহামারীতে সবুজ হয়
তামাটে রঙের চোখগুলো
সিনাই মরুভূমির মতো পাষাণ নাস্তিকও
দু-একবার আল্লাহ আল্লাহ করে।

কিন্তু আমার গ্রামের মহব্বতেরা
ফুটপাতের আমির আলীরা
প্যাডেল ঘুরানো রিক্সওয়ালা
রোজকার ডাল-ভাতে সন্তুষ্ট শ্রমিক
দিন- মুজুুরেরা
দুঃখে অথবা সুখে বিশ্বাসের পরিবর্তন নেই
দরিদ্রতার আকাশ ছুঁয়েও
তারা সিজদায় থাকে কাবা-শরীফে।

তারা মহামারী অথবা দুর্যোগ বুঝে-না
সোয়াইন-ফ্লু অথবা করোনা বুঝে-না।
তারা শুধু পূর্ব-পশ্চিম বোঝে
উত্তর-দক্ষিণ বোঝে
তাদের হৃদয় চিরতরে নত, নত-মস্তকে।

গৃহবন্দী
দালান জাহান

গৃহবন্দী ধরনী আজ ফান্দে পড়ে
কান্দে ভাই
জলজ্যান্ত মৃত্যটারে সাবান দিয়ে
বান্ধে তাই।

জীবন নিয়ে জগতবাসী ঘর-গোলাতে
ক্ষান্ত হয়
ঘর ছাড়া আর ঘরবাড়ি নেই এই ভাবনায় শান্ত হয়।

আতঙ্কের এই দিনগুলোতে বুকের মাঝে শব্দযান
নাগাল পেলে হাঁচির কাঁটা এক পলকে
জব্দ জান।

ঘুম আসে না ঘুম আসে না ঘুমের ঘোরে
কষ্ট হয়
একই দুঃখে বিশ্ব কাঁদে সময়টা আজ
নষ্ট হয়।

কান্নার কার্ফিউ
দালান জাহান

বাতাসে কার্ফিউ
অঝোরে কাঁদছে গাইয়ার গর্ভবতী সন্তান।
বিকল পৃথিবীর পথে পথে মৃত্যুর গন্ধ
দিন থেকে দিন ছাড়িয়ে যায়
কবর স্নিগ্ধ মাটির ফুলেরা।

অলঙ্কার স্নিগ্ধ ঐতিহাসিক ক্রন্দনে
আকাশ থেকে বহমান সুতীব্র লাল রেখায় সমবর্তিত সবুজ স্বাক্ষীরা।

নিবিড়-নীরতায় রক্তে প্রবাহিত বিশ্বগ্রাম
শুধু বাঁচার আকুতি নিয়ে কালের লেজ ধরে
উপরে তাকিয়ে আছে
বাড়ি-ঘরেরা জমিন-জানালারা।

অ্যালকোহল চুল
দালান জাহান

সাবধান সন্ধ্যায় বসে সুতো কাটছেন
নিশাদেবী নিক্সের মেয়ে
প্রকৃতির বাধ্যগত সন্তান হয়ে
ঘন কালো আলোতে ঢুকে যাচ্ছে
বৃক্ষজাত নারী ও পুরুষ।

ছুঁড়ে ফেলে ব্যস্ততার ভাঙা ডিম
আবার সংসারে উড়ছে
উর্বশী রমণীর অ্যালকোহল চুল।

মাটি ও মানুষের ভরে
আহা কি সুন্দর ভরে উঠেছে
দুঃখনদীর আকেরন দেয়াল।

আযানের ধ্বনি
দালান জাহান

চারদিকে শুনি আযানের ধ্বনি
নাস্তিকগুলো কোথাও করে কানাকানি।
এইযে মরণ বিস্ময়-বিশ্ব
বাতাসে ভেসে যায় মৃত্যুর পানি
যেদিকে তাকাই বুঝি শুধু এক
একক বিধাতার অমিয় বাণী
যম-জাঙ্গালে দাখিল দণ্ড-তুফান
নির্যাতিত ধরনীর পেটে
অশ্রু অক্ষরে ফুটে দাম্ভিক মানুষের গ্লানি
বাঁচাও আল্লাহ্ বাঁচাও ভগবান করো মেহেরবানি
চারদিকে শুনি আযানের ধ্বনি।

Poet Dalan jahans poem

প্রতিবছর ছেলেটা আসতো
দালান জাহান

প্রতিবছর এই দিনে ছেলেটা আসতো
কলমিলতায় হেলেঞ্চাপাতায়
ছেলেটার রক্তিম ছবি ভাসতো
দুয়ার খোলা জননীর লেংটা শিশুরা
মুখ ও কপালের মাঝখানে দিত আনন্দ দৌড়
রক্তঝরা মুখখানা তার বারুদের মতো হাসতো।

আজও তো সে এসেছে দেখেছি
বিষণ্ণ শিবির মৃত্যু মিছিল পেরিয়ে
আজও তো সে এসেছি দেখেছি
যমদূত আজরাইলের পথ মাড়িয়ে
অথচ তার আগমনে সোনার দেশের
সোনার ছেলেরা খুশির জোয়ারে ভাসতো
প্রতিবছর এই দিনে ছেলেটা আসতো।

মানুষ নামের অমৃত অর্থ
দালান জাহান

মানুষের চেয়ে অসহায়
আর কেউ নয়
তবুও মানুষ অহঙ্কারে
কতো কথা কয়।
দিন শেষে একই মানুষ কাঁদে
এক আশ্রয় তলে
সব পাওয়া হয়না পাওয়া
গাঁয়ের বলে।
ভালোবাসা থেকে বড়ো ধর্ম
পৃথিবীতে নেই
আজও বুঝে-না মানুষ অমৃত
কথা-খানা এই।

মৃত্যুর গান
দালান জাহান

অন্ধকার সীমা ভেঙে সৃষ্টি করে
শ্রেষ্ঠত্বের শ্রেষ্ঠ অঙ্গীকার
অথচ বিরাট আকাশের তলে
মহিমান্বিত হয় সূর্য দেবতার মুখ
একইভাবে একত্রিত তুমি আমি
আমরা নদীর কান্না শুনি
ঘরের দরজা খুলে দেখি না কভু
কী গভীর বেদনায় সমুদ্র ভেঙে যায়
নৃত্যরত ধরনীর বুক।

সেদিন একটিই আঙুল থাকবে আকাশে
দালান জাহান

যেদিন শীতল পাটির মতো
ভাঁজ হবে আকাশ
আর গ্রহে গ্রহে ঘটবে-
প্রাণের বিমূর্ত বিস্ফোরণ।
দখলদারিত্বের প্রতিশোধ স্বরুপ
জাম-জাঙ্গালে নীল যুদ্ধের জোঁদা।
সবুজ অন্ধকারে ঢেকে যাবে পথ
কান্নার নদী থেকে কেউ-
প্রাণকেন্দ্রে ছুঁড়ে মারবে
অচেনা অগ্নি বলয়।

একটি হিম শীতল পতাকা
ঢেকে দিবে সমস্ত অগ্নি জঠর
এবং এক অলৌকিক চিংকারে-
ভেসে আসবে ঈশ্বরের ক্ষমতা
সমস্ত মৃতেরা একত্রিত হবে-
হিম শীতল জলের উপর।

সেদিন একটিই আঙুল থাকবে আকাশে।

মানুষের নদী
দালান জাহান

ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে অতিক্রম করেছি
হাতের তালুতে আঁকা বিপন্ন ধর্মের পাঁচটি নদী।
মৃত্যু-কাতর পতঙ্গ হয়ে ঢুকে পড়েছি
থ্যানাটসের পায়ের পাতালে
ভালোবেসে যিনি গলায় ঢেলে দিয়েছেন
সৌভাগ্যময়ী লীথিরের সমস্ত জল।

মনে পড়ছে মানুষ শব্দটাকে
কতটা ক্ষতবিক্ষত করে এঁটে দিয়েছিলাম
নিপিড়ীত নির্যাতিত মানুষের মুখে।
সব অহঙ্কার পুস্তকে-পুঁতে
জবাইকৃত কবুতরের মতো ঘুমিয়েছে মানুষের নদী।

Poet Dalan jahans poem

সুখের অসুখ
দালান জাহান

প্রিয় মায়াবতী, মানুষ কী করে এতোটা
একা হতে পারে তুমি কি বলতে পারো।
একটা মানুষকে চিরতরে একা করে দেওয়া
আর হত্যা করার মধ্যে পার্থক্য কোথায়
তুমি কী জানো?
হত্যায় মানুষ একবার মরে আর বেঁচে থাকতে
যে সবচেয়ে একা হয়ে যায়
সে বার বার মরে। তার মৃত্যুর যেন শেষ হয় না।

তুমি বেঁচে থেকো ভালো থেকে
বুড়ো শয়তানটা যেন তোমার গাঢ় না ভাঙে।
তুমি কী জানো এই বুড়োটা
প্রথমে নিজের বউকে বিক্রি করেছে
একজন দই ওয়ালার কাছে।
তারপর নিজের মেয়েকে বিক্রি করেছে
একজন শুটকি ওয়ালার কাছে।
জানি না কবে তোমাকে কার কাছে বিক্রি করে। আবার সেই লোকটা যেন আমি না হই।
সাবধানে থেকো।

আজকাল তোমার মুখের দিকে
তাকানো যায় না।
কেমন স্বার্থপরের মতো দৃষ্টি তোমার।
সেদিন বিকেলে মেলায় তোমাকে দেখে
মনে হলো পুরো মেলা মাথায় নিয়ে
তুমি দৌড়াচ্ছ পাগলিনীর মতো।
আজকাল তুমি তাকাতেও জানো না।
কোনদিক থেকে কার দিকে তাকাবে
কাকে ছেড়ে, কাকে ধরবে কি যে ব্যস্ততা তোমার!

এখানে আকাশ নেই।
রাত্রির চোখ থেকে নেমে আসে বেদনার গান।
সেই গান শুনতে শুনতে জেগে ওঠে ঝিঝি পোকারা।
ঝিঝি পোকা ওড়ে আমিও উড়ি।
দুঃখ আমাকে গিলে ফেলেছে আর
আমিও দুঃখকে দিয়ে যাই সবটুকু সময়।
তারচেয়ে ভালো কোন বন্ধু আজকাল
আমি খোঁজে পাই না।
সত্যিই মায়াবতী আমার সুখের অনেক অসুখ।

আগুনের গর্ভ থেকে বলছি
দালান জাহান

আগুনের গর্ভ থেকে বলছি
আদত বিশ্ব ডুবান আগুন
অবিচার দ্রারিদ্র ক্ষুধার আগুন
সীমারেখার দাগ্রিমা কেটে
মৃত্যযুগের শুরু
কোটি বছরের তারা খন্ড আমি আমরা
জনম জনম ধরে জ্বলছি ।

মহাগগণ ভরে গেছে
ভিনদেশি ভিন্ন গ্রহের প্রাণে
শিকড়ে শিকড়ে অরুণ রাঙা
মৃত্যক্ষুধার হাড়
হাজার বজ্রপাতে ঘুমঘোর নিশিশেষ
বিস্রস্ত দেবতার মন্ডু নিয়ে
ধূসরসন্ধ্যা উড়ে মিথ্যা ভরা বিশ্ব অনিমেষ ।

গোধূলির অগ্নিধূলোয় রাঙা
মজলুমের মুদিত নিঃশ্বাস দীপ কালে
জন্মজননীর ডানা ভরা আকাশ ছায়া
দুঃশাসনের আঁখি চুম্বন খেলে ।

অক্ষের ঘূর্ণন শেষে
মিথ্যা বাণী হয় মানুষের শিল্প শাসন
ইথার ভাসে নির্লিপ্ত চোখের কাহিনী
অনাঘ্রাত শন্নির দশা
পাতালের ভোগবতী পৃথিবীর জ্বালানি স্টেশন ।

দীনে মোহাম্মদ গেল
শান্তির অবতার হয়ে
সত্যযুগে ফিরে দেখ
নির্বাণ প্রদীপ গেছে রয়ে ।

আবার আগুন জ্বলবে
বিশ্বপোড়া আগুন প্রারম্ভের আগুন
কালজ্ঞ ত্রিবেণী নিদর্শনে
উল্টে যাবে ধরনী সঠিক অবস্থানে
মিলিয়ন মিলিয়ন বছরের শোষণে
পুণ্য আর পাপের লড়াইয়ে
লাশের পরে লাশ পড়বে
দুর্গন্ধ হবে বিশ্ব অজানা ভাইরাসে
মৃত্যু ভয়ে দৌড়ে পালাবে মানুষের ভেলা
প্রাণহীন দেহগুলো সৎকার করবে কে ?

শৈবাল শিশু
দালান জাহান

পিচঢালা রাস্তায়
শামুকের মতো হেঁটে যাচ্ছে
অদ্ভুত মেকাপ ওয়ালা সমুদ্রগামী শব্দ
আলপনায় আলপনায় এরা ঢেকে ফেলেছে
হিরণ পণ্ডিতের গাণিতিক সুখ।

কাগজের ন্যাপকিনে শুকিয়ে যায়
ঋতুবতী হৃদয়ের মাসিক
দুধের মতো সাদা রক্তে সাঁতার কাটে
পঙ্গু বোধের শৈবাল শিশু।

এলাকার মাথা বিনয় বাবু
নিজেই এখন মাছের বাজার
তিনি যা আওরান তা সাহিত্য
তিনি যা চর্চা করেন তাই মহাসত্য।

Poet Dalan jahans poem

সমাবর্তন
দালান জাহান

বসন্তহীন মরুভূমিতে
আমি এক সমাবর্তনের অপেক্ষায় থাকি
দুর্গার মতো আত্মতেজে যারা
ইহুদি ও মিথ্যেবাদীদের
একই পাল্লায় তোলে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়।

বৃষ্টিহীন আকাশের নিচে
আমি এক সমাবর্তনের অপেক্ষায় থাকি
মুহাম্মদ ও কৃষ্ণ জপমালায় যারা
এক সাথে ডোবে যায় নৈঃশব্দের ভেতর।

কারণহীন রক্তডোবায় দাঁড়িয়ে
আমি এক সমাবর্তনের অপেক্ষায় থাকি
ব্রাহ্মণ ও মৌলভীরা যেথায়
নিজেদের নাম ও ধর্ম ভুলে
স্থান কাল ও সময় ভুলে
অনন্ত কাল ধরে পান করে যায়
প্রেমিক ঈশ্বরের অনন্ত প্রেম।

দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে অমানুষ
দালান জাহান

দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে
মোহাম্মদী বেগ
বিষাক্ত ষড়যন্ত্রের বিষ নিয়ে
হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছেন
ঘসেটি বেগম
ভেতরে এক পা দিয়ে আকাশ হাত চাটছেন
বিশ্বাসের মতো কাছের বন্ধু
ও শ্রেষ্ঠ ঘাতক মীরজাফর।

স্বপ্ন ভাঙার একশো বছর পরেও
এখনও স্বপ্ন মানুষ দেখি না
দিন রাত পায়ের কাছে
যে কুকুরটি বসে থাকে
জোছনার আলো পড়লেই
তাকে কেমন মোশতাক, মোশতাক লাগে।

সুরানার বাঁচা মরা
দালান জাহান

চুঞ্চিত আঁধারে ধরে গুচ্ছ গুচ্ছ প্রাণ
উড়ে যায় সুদিনের সবুজ পাখি
ওদিকে মরা নদী হাক ছাড়ে
লোহার বেষ্টনীতে বন্দি হৃদয়
সকালে বিকেলে হাহাকার ঝরে
ভালোবাসার মতো নিষ্ঠুর আদরে
মরে যায় কেউ কেউ
কেউ কেউ আবার হত্যা করে।

সুরানা তুমি কোথায় দেখেছ
এমন মানব জন্ম
জন্মেই যে সন্তান মা’কে ভক্ষণ করে
বস্তুত মানুষ জন্মে একবার
অথচ শুধু বেঁচে থাকার জন্য
বার বার মরে বার বার মরে।

মৃত্যুর যাত্রী মিথ্যে বলে না
দালান জাহান

জীবন ও মৃত্যুর মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে
আমি স্মরণ করতে চাই
সেই অন্ধকার নদীর নাম
যার পেট ভরে আছে কাঁচা কাঁচা সোনায়
স্মরণ করতে চাই একমাত্র অতিথির কথা
যার সাথে আমার আলিঙ্গন হয়েছিলো
না মাটিতে না আকাশে
বিশ্বাস করো এই দীর্ঘ রাতের
কোন উৎস খোঁজে পাই না
একজন মৃত্যুর যাত্রী কখনও মিথ্যে বলে না।

দরিদ্র ঘামে মিশে যে অশ্রু
মিলিয়ে যায় শরীরের কোষে কোষে
সে একদিন কালো অক্ষরের শিরোনাম হয়
তার জন্য ক্যামেরা নড়ে বিবৃতির খরচে
আকাশে ওঠে মিথ্যেবাদী প্রেসগুলো
অথচ বেঁচে থাকতে তাকে তো কেউ চিনে না

Poet Dalan jahans poem

কাঁদো তুমিও কাঁদো
দালান জাহান

একদল বানর ডালে বসে
লোম কচলাতে কচলাতে
ঘাসের মাথায় ছুঁড়ে মারছে বিষাক্ত থুথু
আর তাই অমৃত ভেবে
চেটে খাচ্ছে আরেকদল শিম্পাঞ্জি।

বিড়ালগুলো শেকলে বেঁধে
অট্টালিকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে
কতগুলো সাদা-শুয়োর
ইচ্ছের ফরমানে আজ
মহব্বতের মানুষ শব্দটি অভিধান হত
এতো আলো এতো সুবাস
কই যাচ্ছে! কোথায় যাচ্ছে!
যা হবার কথা নয় তাই হচ্ছে।

কাঁদো কাঁদো
এই তো কান্নার শ্রেষ্ঠ সময়
জল কাঁদছে নদী কাঁদছে
আকাশ কাঁদছে মাটি কাঁদছে
সবুজ কাঁদছে অবুঝ কাঁদছে
আঁচলে মুখ লুকিয়ে নিভৃতে কাঁদছে
বীরাঙ্গনার অনাথ শিশু।

এই তো কান্নার শ্রেষ্ঠ সময়
কাঁদো তুমিও কাঁদো।

হাসির শরবত
দালান জাহান

আমার ছোট্ট শিশু ব্যাট করতে গেল
কিন্তু ব্যাট হাতে নিয়ে
মাঠে নামলো প্রধান অতিথি
আম্পায়ার আঙুল তুললো
আকাশের দিকে
চার ছক্কা ছক্কা চারে
ব্যাটিংয়ে উঠলো তুফান
দর্শকদের কোন হৈ-হুল্লোড় নেই
এজন্য শত শত ট্রাক ভরে
হাসি আমদানি করা হলো
তখন তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে
শরবতের মতো হাসি পান করলো।

এমন আনন্দ খুনে সাদা-কালো দোয়েলরা ডানা থেকে খুলে ফেলছে পালক
তারা চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে
উড়ার স্বাধীনতা।

এইটুকু পথ হেঁটে যাবো
দালান জাহান

এইটুকু পথ
হেঁটে যাবো বলেই ঠিক করেছি
ধানের পেট কেঁটে ক্ষুধার ক্ষুরে-
সর্ষের ঘুমটা খুলে ঘুমের ঘোরে
মৃত্যুর হুইসেল ভেঙে-
সাদাকালো দোয়েলের লেজ এঁকেছি।
উঠবনা আর যন্ত্র চেপে-
মাটি ও মানুষের গন্ধ মেপে
উড়বনা হামিদ-হাসির হুড়ে
শহরের গলি থেকে-
নাগরিকের নীল কিনেছি

যে পথে হারিয়ে গেছে
বিনিদ্র বিবেক বিশ্বের মুখ
জীবনের রক্তে-রঙিন
মহাকালী-মাইলের বুক
দুরন্ত টায়ারের দুর্বার-ঘর্ষণে বিরাট
লাভাময় পিচের, করুণ কঙ্কর বালি-
গৃহিণীর কবর সমান কান্নার কালি
সমস্ত সাহসের সুলুক হয়ে-
মৃত্যুর দাবি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।

সবটুকু রঙ বিকিয়ে
সবুজ মাংস মাগে শয়তান র্যালী
ঝাঁঝালো মিছিলের মহনীয়-প্রান্তরে
রুদ্রের বুক ছিঁড়ে
ঢেলে যায় সমগ্র লালিমার লালি
সমুদয় সুর্যোদয় নিয়ে-
আটলান্টিসের মতো, ডুবে যাবো বলে-
কথার বাঁশি থেকে ছলনার-ছলে
মলয়সম শান্ত শিবিরে, সুখের সমুদ্র গিলেছি
এইটুকু পথ হেঁটে যাবো বলেই-
ঠিক করেছি।

পাপী
দালান জাহান

আমি খাঁচা ভেঙে ওড়ে যেতে চাই
কিন্তু আমার শিশুকন্যার
ফুলের মতো আঙুল
সে তার আব্বু দিয়ে বেঁধে রাখে হাত।
শয়তান শক্তি দিয়ে চেপে ধরে হৃদয়
প্রেম ভালোবাসা বিরহ কান্না অথবা
আবেগ অনুভূতিগুলো ভাগ করে
বিক্রি করে দেয় জুয়ার বোর্ডে
কপাল ফেটে বেরিয়ে আসে
আমার প্রধান অতিথি
যার হাতে ভিক্ষার থালা।

তাই কখনও মিছিলে যাওয়া হয়নি
লেখা হয়নি দুটো সংগ্রামী অক্ষর
আমি চোর- আমি পাপি
আজন্ম কালের পাপ নিয়ে পালিয়ে বেড়াই
আমি যা বলতে চাই তা বলতে পারি না
আমি যা লিখতে চাই তা লিখতে পারি না।

Poet Dalan jahans poem

অসুস্থতা
দালান জাহান

পৃথিবী ও সূর্যের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে
তিনি বললেন
স্বর্গ থেকে নেমে আসে যে শব্দস্রোত
তা একধরনের অসুস্থতা
তিনি আরও বললেন
তবে এই অসুস্থতা যার দিকে যায়
সে হতে পারে পরিপূর্ণ মানুষ।

যারা প্রজাপতি লয়ে
সুবিধার শব্দ যোগ করে কলঙ্কিত করেন মানুষের ইতিহাস এবং দিন শেষে
একটি বেশ্যার পুত্তলিকা নিয়ে
আনন্দে আনন্দে ওড়ে যান মহাকাশে
তাদেরকে তিনি সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত বলে উল্লেখ করেছেন।

সবশেষে সবাইকে তিনি
অসুস্থতার জন্য দায়ী করেছেন
যারা কিনা ঘুমোতে গিয়ে চলে এসেছেন
নিতম্ব বিছিয়ে রাখা
রমনীর বিবাহ বার্ষিকীতে।

জ্বর
দালান জাহান

যন্ত্রণার নদী সাতরিয়ে আনি
উত্তপ্ত অবুঝ সংলাপ
তারা আমাকে হত্যা করে ঘুমের ভেতরে।

ভালোবাসার মতো দেবী কোথায়
অভিশপ্ত ভূমির মতো পাপ
সমস্ত পৃথিবীর গায়ে যে জ্বর
আমার শরীরে রয়ে যায় তার তাপ।

তবুও লক্ষ্যহীন থাকে আমার হৃদয়ের মাইন।

পবিত্র পাপ
দালান জাহান

ভালোবাসা আমাকে আর ছুঁয়ে যায় না
যেভাবে ছুঁয়ে যায় তোমার চোখের জল।

উল্লাসে হেঁটে আসে পবিত্র পাপ
চারটি আদম পায়ে শুনি প্রথম চুম্বনের গান
যে গান তোলে নিয়ে যায় হৃদয় ছিঁড়ে।

মগ্ন হয়ে ভাবি প্রথম মগ্নতা
প্রিয়ে থেকে প্রিয় আকুল-আকুলতা
কোন ভাষায় কি তা বলা যেতে পারে?
এমন সুন্দর সুখ আর কি হতে পারে ?

মিথ্যেবাদী ও এক বোতল মদ
দালান জাহান

কবি তোমার মিথ্যে অক্ষরগুলো
আমাকে ছেড়ে গিয়েছে
বন্দর ছেড়ে যাওয়া শেষ জাহাজের মতো
আমাকে ঢেকে দিয়েছে কালি
ঝোপের আড়ালে কান্নারত শিশুর মতো
তোমার পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় আটকে যাওয়া আটা
আমাকে স্তব্ধ করে মৃত্যু হয়ে
তুমি তোমার মতো মিথ্যেবাদী
দেখিনি আমি দেখেনি পৃথিবী লয়ে।

জখমি জননীর অশ্রু দিয়ে
তুমি রান্না করে খাও বেদনার পায়েস
তুমি লিখোনি মিছিলে মৃত্যু কাম তরঙ্গ তিন
আহা!নিস্তরঙ্গ নির্জনতা তোমার কতো আয়েশ
কবি তোমার বক্ষপিঠে
ছড়িয়ে থাকে স্বর্গ ভূমি স্ফীত উরু কেশ
তুমি এমনই এক মিথ্যেবাদী
এক বোতল মদের দামে বিক্রি করো দেশ।

যে নারী আমার পূর্ব পুরুষের ছিলো
দালান জাহান

নারী এক সময় নারী ছিলো।
নারী এক সময় নীড় ছিলো ।
নারী এক সময় নীর ছিলো।

ঘর ছিলো বাড়ি ছিলো
দুনিয়ায় মতো দুনিয়ার বুকে
আরেকটি সুখের দুনিয়া ছিলো।

আমি সেই নারীর কথাই বলছি
যে নারী আমার পূর্ব পুরুষের ছিল।

Poet Dalan jahans poem

আবেগি মাছের শিশু চিৎকার
দালান জাহান

একবার নয় দুবার নয় তিন তিন বার
যোগ দিয়েছি মৃত্যুর সমাবেশে
শুধু মরার মতো বাঁচার অসুখে
অতিক্রম করে গেছি আকাশের চেয়ে উঁচু
রাত্রির চেয়ে কালো দীর্ঘ ছায়া
অতিক্রম করে গেছি নদীর কান্না
ফসলের ঢেউ ঝর্ণার-জলকাব্য
মানুষের মতো মানুষের পিঠে দাঁড়িয়ে থাকা
আচানক দৈত্যের দুনিয়া বড়ো মুখ।

অতিক্রম করে গেছি পথের পাখি
নারী ও শিশুর শিকল শীৎকার
জেলের জালে আটকে পড়া
আবেগি মাছের শিশু চিৎকার।
অতিক্রম করে গেছি অভিন্ন ও ভিন্ন গ্রহ
তারাদের যুদ্ধ গ্যালাক্সির খুন
এলিয়েন বসতি হাজার কোটি আলোকবর্ষ
বিস্ফোরিত গ্রেনেডের শতমুখী আঙুল।

সমাবেশে দাঁড়িয়ে একটি কথাই স্পষ্ট শুনেছি
প্রকৃত মানুষেরা মরে যায় মৃত্যুর আগেই।

ধর্ম শুঁকতে শুঁকতে মরে যায় মানুষ
দালান জাহান

সার্বিয়ানের খোলা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে
নলকূপ ছাড়ে একজন গর্ভধারিণী মা
আঁচল উঁচিয়ে তিনি আবৃত্তি করেন
সাদা ও কালো সাম্প্রদায়িক অক্ষর।
মায়ানমারের জ্বলন্ত ভূমিতে জ্বলে
একটি নিষ্পাপ শিশু
মরতে মরতে সে দান করে যায়
শতাব্দীর সবচেয়ে প্রিয় রঙ
উত্তপ্ত আরব বালিতে
নিরাপদে ডোবে যায় ইয়েমেনের মাথা
অথচ একজন রোহিঙ্গা যায় আশ্রয় শিবিরে।

ধর্মের মানদণ্ডে নির্ণয় দাঁড়িপাল্লায়
ডাঙায় উঠা মাছের মতো লাফায়
নাগরিক সংশোধনী বিল
অথচ প্রবল হিন্দুত্ববাদের চাপে পড়া
একদল ভারতীয় গরু খোঁড়
অথবা মায়ের ভাঙা মূর্তি নিয়ে কাঁদা
পরিমল বাবুর সংখ্যালঘু পরিবার
অথবা আর্তনাদ আগ্রাসনে ছুঁয়ে যাওয়া কাশ্মীরের সৌন্দর্য ভূমি
একইভাবে ফুটিয়ে তোলে
মানুষের উপর মানুষের রক্ত কবর।

ধর্ম শুঁকতে শুঁকতে মরে যায় মানুষ
অথচ ওরা বলে মুসলমান।

দালান জাহানের ছড়া

কিন্তু তারা গরু না
দালান জাহান

গরুর মতো কাজ করিলেও
কিন্তু তারা গরু না
টাকায় যারা বিক্রি করে
সার্টিফিকেট করো না।

এমন কোন কাজ থাকে না
যে কাজ তারা পারে না
হার মেনে যায় কোভিড-উনিশ
কিন্তু তারা হারে না।

চার লাইনের কবিতা

রক্তচোষা
দালান জাহান

আমরা সবাই রক্তচোষা
সুযোগ পেলে রক্ত খাই
আমরা সবাই অন্ধ অলি
ঘরে বসেও গন্ধ পাই।

Poet Dalan jahans poem

Facebook Comments