onno nirar golpo

কবিতায় জাগরণ’-এর নিবেদন প্রখ্যাত কবি ও কথা সাহিত্যিক বিদ্যুৎ ভৌমিক’-এর গল্প

ডান ‘-হাতের কব্জিতে ঘড়িটাকে বেশ শক্ত করে লাগিয়ে নিতে নিতে বিরক্তির দৃষ্টিতে একবার তাকিয়েই পরক্ষণে ঝাঁঝালো কণ্ঠে উত্তর দিলো ,– রাতে না-ও ফিরতে পারি ! তোমরা আমার জন্য না খেয়ে ব’সে থেকো না !

সদর দরজাটা বন্ধ হবার শব্দ হোল ! সমস্ত ঘরটায় অন্য এক অচেনা নীরবতায় ছেয়ে গেল । অন্য দিনের মতোই নীরা প্রতিদিনই এ সময়েই বাড়ি থেকে বেড়োয় । এটা কোন আলাদা পরিকল্পিত নিয়ম নয় , যার কারণে বাড়ি শুদ্ধু লোকের মুখ হাড়ি ! সকাল নটা থেকে রাত সাড়ে আট্টা ! স্বাভাবিক যাওয়া আর বাড়ি ফিরে আসা । তাহলে আজ এতো নীরার চোটপাট কিসের ! খবরের কাগজটা টেবিলে ছুড়ে ফেলে দিয়ে মৈনাক বাবু দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর সহধর্মী হৈমন্তীর দিকে তাকিয়ে বললেন ; দাও বাজারের থলিটা পিণ্ডি যোগার করতে যাই ।

এই হোল মৈনাক বাবুর পরিবার । ভাদ্র শেষে আকাশটা ওদের ঘর ও সংসারের মত গুমরে রয়েছে ! সকালের প্রথম চা’- খাওয়াটা মৈনাক বাবুর কপালে জুটলো না ! হাতে চায়ের কাপ প্লেট ধরে দরজার পাসেই চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন হৈমন্তী দেবী , সাহস হয়নি তাঁর স্বামীকে বলা ; শুনছো চা – টা খেয়ে তবে বাজারে যাও । উত্তর কোলকাতার পাঁচ মাথার মোড় থেকে একটু এগিয়ে এসে বিজয়া ব্যাঙ্ক , তার বিপরীতে চওড়া একটা গলি । সেই গলি ধরে সোজা কিছুটা হেঁটে এলেই বা হাতে একটা সরু রাস্তা তারই বাহাতে মৈনাক বাবুর বাড়ি । ‘হৈমন্তী ভিলা’ !

onno nirar golpo

পূর্ব পুরুষের ভিটে ! সেটাও ভেঙে ফেলেছেন মৈনাক বাবু ! কর্ম জীবন থেকে অবসর নেবার পর পেনশনের বেশ কয়েক লাখ টাকা খরচ করে পৌনে দু কাঠা জমির উপর এই একতলা বাড়ি । কর্তা গিন্নি ও ওদের একমাত্র কন্যা নীরা ! মনটা সকাল থেকেই বিগড়ে ছিল নীরার ! ওর প্রিয় গোপাল থেকে কেনা পছন্দের শাড়িটা আজ পড়ে রাহুলের সাথে দমদম বিমান বন্দর থেকে এক সাথে ওকে সঙ্গে নিয়ে ফেরার কথ । রাহুল প্রায় দু -বছর পর কোলকাতায় নিজের ফ্ল্যাটে ফিরছে ! কিন্তু শাড়িটার সাথে যে ম্যাচিং ব্লাঊজ পিসটা দিয়েছে , সেটা নীরা বানাতে দিয়েছে দু সপ্তাহ আগে । ওটা তৈরি হয়নি ! সেই কারণেই মেয়েটার সকাল সকাল মাথা গরম ।

পছন্দের কেনা শাড়ি তার হলুদ বরণী শরীরে চোড়লো না ! কেনা শাড়ি মায়ের বাপের বাড়ি থেকে বিয়েতে পাওয়া কাঠের আলমারিতে বন্দী হয়ে রইলো ! অফিস থেকে অনেকটা আগেই বেড়িয়ে ছিল নীরা । রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল ট্যাক্সি ধরার অপেক্ষায় । তিনটে চুয়ান্ন-তে রাহুল প্লেন থেকে নামবে । সে’রকমই কথা ছিল নীরার সাথে , তাই একটু আগে না পৌছালে ব্যাপারটা ঠিক মনের মতো হয় না । ফ্লাইট যে এতোটা লেট করবে কে জানে ! চার কাপ কফি-ও টেনসানে খাওয়া হয়ে গেছে । মনের ভেতরটা হাঁসফাঁশ করছিল ; কত দিন পর রাহুল কে সে সামনা সামনি দেখবে ! সেই দু’বছর আগে প্রমোশন নিয়ে সোজা আমেরিকায় !

ওখানে অফিস থেকে ফ্ল্যাট , গাড়ি , আরও কত কি সুযোগ পেয়েছে রাহুল । রাতে শোবার আগে রাহুলের সাথে নীরার প্রতিদিন ভিডিও চ্যাটে কথাও হয় । ওরা দু’জনেই স্কুল লাইফের বন্ধু । ছোটো থেকেই এক সাথেই বেড়ে ওঠা । তারপর প্রেম ! প্রেম বলাটা ভুল ! মন দেওয়া নেওয়া । গতকাল রাতে পশ্চিমের দিকের জানলাটা খোলাই ছিল । চাঁদ উঠে ছিল , কিন্তু মাঝেমধ্যে মেঘ এসে ঢেকে দিচ্ছিল ওর অহংকার মাখা জ্যোৎস্নাকে । নীরার মনে হয়ে ছিল ,– রাহুল-কে লেখা সেই চিঠির কথা । ‘তুই যদি না আসিস ; তবে বৃষ্টি হবেনা কোনদিন’ । বিমান বন্দরের ওয়েটিং রুমে বসে সেই চিঠির কথা একমনে ভাবছিল নীরা ! হাল্কা আকাশী রঙের শাড়ি , কালো রঙের ব্লাঊজ । কপালে ছোট্ট একবিন্দু টিপ ! কাঁধে শান্তিনিকেতনি ব্যাগ ।

দু’হাতে আলতো করে ধরা একগুচ্ছ রজনীগন্ধা ! বেণুনী করা এক গোছ চুল কোমর নীচ পর্যন্ত এসে থেমেছে । চোখে ফ্যান্টাসি থেকে কেনা সানগ্লাস ! এই হোল নীরা ! কতক্ষণ এভাবে ব’সে ছিল , ভুলেই গেছে । বিকেল সাড়ে তিনটে থেকে সন্ধ্যা ছটার কাছাকাছি এক জায়গায় একই ভাবে বসে থাকা ! মাঝেমাঝে ঘোষণা হ’চ্ছে ফ্লাইট এসে পৌঁছাবে সাতটা বেজে সাতাশ মিনিট । এই আদল ভাঙা সময়ে নীরা’র ভেতর গভীরে বসে থেকে থেকে এক জটিল অস্থিরতা ওকে গ্রাস করে ফেলছিল ! এই উচাটন উচাটন মন হাঁসফাঁশ করছিল ; কখন রাহুল এসে তার সামনে দাঁড়াবে । সে–ই প্রতীক্ষা করছিল নীরা । মোবাইলের সুইচটা-ও বন্ধ করে রেখেছে রাহুল !

onno nirar golpo

আজ অফিসের বস’কে বলে অনেক আগেই ছুটি নিয়েছে নীরা , রাহুল’কে পীকাপ করার জন্য । কি আবোল তাবোল চিন্তা ওর মনের গভীরে ঘুরছিল ফিরছিল । মনে মনে গালমন্দ করছিল রাহুল’কে । বাইশের তন্বী তরুণী এই নীরা । রৌদ্র স্ফটিকের ওর শরীরের রঙ । দেহের গড়ন অনেকটাই কবির কল্পনায় নদীর মত । চোখ দুটো এক আকাশ ভালোবাসায় মাখা । আর ওষ্ঠযুগল ? প্রিয় পুরুষের কতকালের চুম্বনের জন্য অধীর প্রতীক্ষায় ব্যাকুল !

ট্যাক্সিটা হু — হু করে অবিশ্রান্ত বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে ছুটছিল । রাহুলের পাশে বসে থাকতে নীরার ভালো লাগছিল । একটা নির্ঘুমের ভেতর স্বপ্ন যেন নীরার মনটাকে আদ্যোপান্ত ভাবে আবেশে ঢেকে রেখেছে ! কি ব্যাপার চুপ করে আছো , কিছু বলবে না ! আমি এতদিন পর দেশে ফিরছি , কিছু বলো ? জানিনা কি বলবো , শুধু মনে হচ্ছে ,– আমি কি স্বপ্ন দেখছি ? ট্যাক্সির খোলা জানালার বাহিরের দিকে অপলক তাকিয়ে নীরা অস্ফুট স্বরে ব’লল । ট্যাক্সি আপন মনে দমদমের পীচের মোড়াম রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে । স্ট্রীট লাইটের আলোয় কোলকাতার রাস্তা রাতের অন্ধকারে বৃষ্টির রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে ! তুমি কি এখন সোজা শ্যামবাজারে যাবে , নাকি আমার বালিগঞ্জের ফ্ল্যাটে আমার সাথে যাবে ,—– ।

নীরা চুপ করে থাকে , রাহুলের কথায় কোন উত্তর দেয়না । কি , কিছু বলছো না যে ? তুমি দেখছি সেই ক্লাস নাইনের নীরাই আছো , কিছুই বদলাইনি ! নো চেঞজ ! রাহুলের কথায় চুইনগাম চিবতে চিবতে নীরা মৃদু হাসলো । কিছু অন্তত বলুন ম্যাডাম ? না মশাই , আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে । তুমি যে আজ কোলকাতায় ফিরছো , এটা আমার বাড়ির কেউ জানে না ।

তা ছাড়া আমি যে তোমার সাথে আছি , এটাও আমার বাপি মা কেউ জানে না । কেন , তুমি ওদের বলনি ? নীরা চুপ করে থাকে । বৃষ্টির গন্ধ মেখে কল্লোলিনী কোলকাতা আরও যেন সজীব হয়ে উঠেছে ! তাহলে তুমি বাড়িতে—ই । আজ্ঞে হ্যাঁ মশাই , বাড়িতে । তাহলে তোমাকে শ্যামবাজারে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেই । না , আমি একাই যেতে পারবো । তুমি বরঞ্চ গিরিশ পার্কে ট্যাক্সিটাকে দাঁড় করিয়ো । আমি মেট্রো ধরে পৌছে যাব । জো হুকুম ম্যাডাম ।

আজ অনেক দিন বাদে আকাশটা পরিষ্কার হয়েছে । কিছুদিন নিম্ন চাপের কারণে শ্যামবাজারটা ডুবে ছিল ! আজ নীরা বাড়িতেই আছে । রবিবার , এমনিতেই ছুটির দিন । এ – কদিন মৈনাক বাবু জলকাদা ডিঙিয়ে বাজার নিয়ে ফিরেছেন । আজ শ্যামবাজার এলাকায় জল নেমেছে , তাই সাত তাড়াতাড়ি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বাজারের ব্যাগটা নিয়ে রওনা দিলেন , কিন্তু ছাতাটা নিতে ভোলেন নি । এই ভাদ্র শেষে আকাশকে কোন ভাবেই বিশ্বাস করা যায় না ! বাজারে ভালো ইলিশ উঠেছে ! অনেক দিন নীরা ইলিশ ইলিশ করছিলো , মৈনাক বাবু তাঁর মেয়ের মনের কথা বুঝে ইলিশ-ই এনেছেন । কি-রে মা আর এক পিস দেই ? তুই দেখছি কিছুই খাচ্ছিস না !

onno nirar golpo

খাবার সময় কি এতোসব ছাইপাঁশ ভাবছিস বলতো , নে নে খা দেখি ! পাশের ঘরে মৈনাক বাবু ভাত খেয়ে ঘুম দিয়েছেন । এঠো থালা বাসন তুলতে তুলতে হৈমন্তী দেবী নীরাকে কথাগুলো বলছিলেন । নীরা একমনে মাছের কাঁটা বেছে চলেছে , মায়ের কথায় সে কোন উত্তর দিচ্ছে না । তার খাওয়া-তে আজ মন নেই বল্যেই চলে ! মন ভালো থাকবে কি করে , গতকাল রাতে নিজের ঘরে বিছানায় শুয়ে ভিডিও চ্যাটে রাহুলের সাথে খুব ঝগড়া ঝাটি করেছে নীরা ! আজ তারই ঝড় চলছে নীরা’-র শরীরে ও মনে !

গতকাল রাতে কতবার যে ঘুম ভেঙে ছিল , একমাত্র নীরা’-ই জানে ! সকালে সেই মন খারাপ নিয়ে লিখেছিল দু — চার লাইনের কবিতা । ,– ‘ মধ্যরাতে আচমকা ঘুম ভাঙলে আক্ষরিক মিথ্যার কাছে অবিন্যস্ত হয় নির্জনতা / তবুও সেই নির্ঘুমে ক্ষমা চাওয়ার মত এসে দাঁড়াই মুখ নিচু করে / এই বোধ এক ঘর নষ্ট অন্ধকারে আমাক জ্বালায় পোড়ায় অহর্নিশ / অথচ তোমার অদেখা অভিমানের কাছে আমি হেরে যাই ! / ‘ এরপর আর সাদা পৃষ্ঠায় এক কলম’-ও গড়াই-নি ! নীরা তার কলমটাকে টেবিলে রেখে ঘুমানোর চেস্টা করতে করতে কখন যে ঘুমন্ত ঘুমে ডুবে গেছে , সে বুঝতেই পারেনি !

কয়েক দিনের জন্য ছুটি নিয়েছে নীরা । মৈনাক বাবুর শরীরটা কিছুদিন ধরে বেগোড় বাই করছে ! হার্টের প্রবলেম ! ডঃ তীর্থঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো একজন কাডিওলজি-কে দু’দিন আগে দেখিয়েও এনেছে । ডঃ বলেছেন ,– মৈনাক বাবুর হার্ট ব্লকেজ হয়ে আছে । এই বয়েসে অপরেশন না করানোই ভালো , তাছাড়া ওনার আবার সুগারের প্রবলেম ! তাই ওষুধের মাধ্যমে যতটা ওনাকে ভালো রাখা যায় ! তবে – কি স্মোকটা ওনাকে ছারতে হবে , এটা যদি উনি চালিয়ে যান তাহলে আমার হাতের বাহিরে চলে যাবেন ! আমার আর কিছু করার থাকবে না !

এদিকে রাহুল চাপ দিচ্ছে একমাসের তার ছুটির মধ্যে বিয়েটা সেরে নিতে । বিয়েটা হয়ে গেলে কয়েকমাস নীরা বাপের বাড়িতে-ই যেন থাকে । পাসপোর্ট হয়ে গেলে ফিরে এসে ওকে সঙ্গে করে বোস্টনে নিয়ে যাবে । রাহুলের কথায় নীরা কর্ণপাত করে নি , সে রাহুল-কে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে ,– অসুস্থ বাবাকে একা মায়ের দায়িত্বে রেখে সে স্বার্থপরের মতো রাহুলের হাত ধরে বিদেশে চলে যেতে পারবে না । পরে কিছু অঘটন ঘোটেগেলে সে নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারবে না ! রাহুল সেদিন নীরার কথায় কোন উত্তর দিতে পারে নি , শুধু চুপচাপ ওর কথা শুনে গেছে !

onno nirar golpo

মৈনাক বাবুর ছবি থেকে শুকনো মালাটা খুলে নতুন রজনীগন্ধা ও গোলাপ-এর মালা পড়িয়ে দিচ্ছিল নীরা । বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে নীরা তার ফেলে আসা তিন বছর আগের কথা মনে করছিল ! নীরা এখনো অফিস যাচ্ছে ! ওর সিঁথিতে এখনো সিঁদুর ওঠেনি ! রাহুল অ্যামেরিকায় ওখানকার এক বিদেশিনীকে বিয়ে করেছে ! এ-স-ব স্মৃতির সত্যগুলো ঘুরেফিরে দেখা দেয় নীরার দর্পণে ! কিছু কিছু দুঃখ আছে এই মনেতে ভীষণ পরিণত । সেখানে বৃষ্টি হলে মনে মনে শরীরের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা আমিত্ব ডুকরে ডুকরে কেঁদে ওঠে !

শেষবারের জন্য সেদিন রাহুলের কাছ থেকে দূরত্বে চলে যেতে যেতে ঝমঝমিয়ে নীরা’-র দু’চোখ গড়িয়ে শ্রাবণ ঝরে পড়ে ছিল ! কফি হাঊজের টেবিল থেকে সেদিন উঠে আসার সময় নিজের মৃদু কান্নার শব্দ নিজেই শুনতে পেয়েছিল নীরা ! রাহুলের চোখের থেকে নিজের চোখ সরিয়ে নিয়েছিল নীরা , পাছে রাহুল ওকে দুর্বল মনে করে ! এই তিন বছরের ভেতর রাহুল একবারের জন্যেও নীরা’-র খোজ খবর রাখেনি ! এখন নীরা ও হৈমন্তী দেবী , একই ঘরে পরস্পর একা ও একক ! শুধুমাত্র দর্পণ ভিন্ন —- ভিন্ন !!

Facebook Comments