Karuna Acherjee probondha

প্রকৃতি ও করোনা

পৃথিবীতে আজ যেই নির্দয় ভাবে মানুষ নিধন হচ্ছে তা প্রকৃতি আর বিশ্ববাসীর কাছে অজানা কিছু নয়।যা কাল চক্রে বার বার হয়ে থাকে। যেই প্রকৃতি পৃথিবীর সমস্ত জীববৈচিত্র্য, ও জৈববৈচিত্র্য বা,সমস্ত পার্থিব বস্তু সমূহকে নিয়ন্ত্রণে রাখে সেই প্রকৃতি আজ মানব জাতির দুর্দশায় একটুও বিচলিত নয়, বরং মানুষের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি লাভ করে অন্য জীব বৈচিত্র্য নিয়ে বেশ প্রফুল্ল ও প্রশান্তিতে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সৃষ্টির জন্মলগ্ন থেকেই “বিশ্বপ্রকৃতি” প্রাণী জগতের সহায়ক ও পরিপূরক, তবুও কেন জানি না মানবজাতি সর্বদা প্রকৃতির অন্য প্রাণীদের ঠকিয়ে পৃথিবীর সমস্ত কিছু নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসতে দন্ডায়কের ভুমিকা পালন করে থাকেন। তাই হয়ত প্রকৃতিও আজ নীরব বোবা দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। তবে তার আবহাওয়া কিন্তু শোকে ও দুঃখ -তাপে খুবই ভারাক্রান্ত। কারণ প্রকৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছেয়ে যাচ্ছে ঐ করোনা ভাইরাস।

যা আজ বৃহৎ সংক্রমণে রূপ নিয়েছে।
যেদিকেই থাকায় শুধু শুনি একটি শ্লোগান,
করোনা ভাইরাস এর আক্রমণে
নিঃশেষ হচ্ছে লক্ষ লক্ষ প্রাণ।
এ নিয়ে আলোচনা, সমালোচন,ও গবেষণা চলছে অবিরাম।

Karuna Acherjee probondha

বর্তমানে কোভিড ১৯ করোনা ভাইরাস এর প্রকোপে বিশ্বের সকল মানব জাতি এখন এক স্নায়ুযুদ্ধেও আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। তাই এই অপশক্তি করোনা ভাইরাস এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য৷ বিশ্ব প্রতিনিধিরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে নিয়ে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কোন সুসময়ে সুসংবাদ জানার জন্য অধিক আশায় বুক বেঁধে অপেক্ষায় আছেন বিনিদ্র মানব জাতি। সবার অন্তকোণে আজ একটায় প্রার্থনা, বিশ্ব বিধাতা পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তা যেন পৃথিবীর মানব জাতিকে রক্ষা করার উপায় প্রদান করেন।

প্রসংঙ্গত কারণে এই করোনা ভাইরাস আজ মানব সভ্যতাকে এক কঠিন ক্রান্তিলগ্নে এনে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।বিশ্বের চলমান গতিকে অযাচিত ভাবে পরাস্ত করার লক্ষে হয়ত দানবরূপী এই করোনা ভাইরাস এর উৎপত্তি । অন্যান্য মহামারির মত এই ভয়ংকর করোনা মহামারির প্রকোপও বিশ্বের প্রতিটি মানুষের ভীত দিনে দিনে শক্তিহীন করে দিচ্ছে। প্রকৃত অর্থে কায়িক যুদ্ধ থেকে স্নায়ুযুদ্ধ মানুষকে অতি তাড়াতাড়ি দুর্বল করে তুলে।সুতরাং স্নায়ুর সাথে সাথে মানুষের মনোবলও চরম ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই পরিস্থিতিতে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের মনোবল টিকিয়ে রাখতে যে অর্থের প্রয়োজন তাও আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে আসছে । রাজনৈতিকএবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও সংকটে নিমজ্জিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পৃথিবীর মানুষের উপর এই মহামারির প্রকোপ অতি প্রবল স্রোতে প্রভাবিত হওয়ায় মানুষ দিকদিশাহীন হয়ে উঠছেন। দিনে দিনে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার যেন বেড়েই চলেছে।

এই মানব নিধন আর মহামারির যুদ্ধ কখন পরিসমাপ্তি ঘটাবে তা এখনো অজানায় রয়ে গেল। আর এই দুর্দিনে মানুষকে আর্থিক বিপর্যয়ের হাত থেকে সুরক্ষা করার জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, দেশের বিত্তশালী দাতা সংস্থা , বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী মহল দলমত নির্বিশেষে যে ভাবে এগিয়ে এসেছেন, তা যদি আরো কিছু দিন অব্যহত রাখা না যায় তা হলে দেশে ক্ষুধাও দারিদ্র্যতা চরম আকার ধারণ করতে পারে।

ক্ষুধা আর দারিদ্রতা এসে মানুষকে যখন গ্রাস করে তখন মানুষ এমন পরিস্থিতির স্বীকার হয় যে নিজের স্নায়ুর সাথে যুদ্ধ করারও সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে।তখন কোন ভালো পরামর্শ এবং শান্তনার বাণী কাজে আসে না। কারণ পেটে খেলে পিটে সয় এই মূলবাক্যটি সর্বদায় সত্য প্রমাণিত। “

Karuna Acherjee probondha

ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি”। এই অপ্রিয় সত্য কবিতাটি লিখেছিলেন বিখ্যাত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। আজকে সবাই এই কবিতার তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা উপলব্ধি করতে পারছি। মনে হচ্ছে বুঝি সত্যি সত্যি পৃথিবীটা অরাজকতা ও ক্ষুধার রাজ্যে পরিণত হতে চলেছে। যদিও ধনাঢ্যরা ক্ষুধার যন্ত্রণাটা উপলব্ধি করতে পারবে না, কিন্তু সাধারণ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা দুর্যোগ কাকে বলে হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছেন ।

তার পরও ধনী গবীর সবাই এককাতারে দাঁড়িয়ে মৃত্যু ভয়ে আতংকিত ও তটস্থ হয়ে আছি। যদিও এই মহাসংকট থেকে উত্তরণের জন্য সবাইকে গভীর মনোবল ধারণ করা আবশ্যক কিন্তু বাস্তবে তা কারো উপর চাপিয়ে দিলেও মেনে নিতে পারছে না।কারণ পাল ছেড়া নৌকা যেমন প্রবল ঝড়ে উল্টে যায়, তেমনি আজ দরীদ্র মানুষের জীবনতরীও উল্টে যাওয়ার উপক্রম ।

অনেকেই লোকলজ্জার ভয়ে মুখ লুকিয়ে হাহাকার করছেন, কিন্তু মান- সন্মান হারানোর ভয়ে নিজেকে আড়াল রেখেছেন। জীবন জীবিকার চিন্তা চেতনায় প্রচন্ড ক্ষত – বিক্ষত হয়ে আজ বিপন্ন মানব সমাজ। এই মহামারি প্রতিরোধে সরকার ও গণমাধ্যম যতই জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য তৎপর হোক না কেন অধিকাংশ মানুষ কিন্তু সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে সক্ষম নয়।

কারণ এক দিকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যতা, অন্যদিকে কর্মহীন বেকার জীবনের অস্থিরতা। আজ মানবিক চেতনায় প্রচন্ড আঘাত সইতে গিয়ে মানুষ কষ্ট -বেদনায় বড়ই ভারাক্রান্ত ও ভীতসন্ত্রস্ত।

মানুষের হাতে এখন করোনা মহামারিটি ধ্বংস করার মতো কোন অস্ত্র (প্রতিষেধক) নেই, অস্ত্রবিহীন যুদ্ধ চলছে এই করোনা ভাইরাস এর সাথে। তবে ০৬/০৫/২০২০ ইং সংবাদ মাধ্যকে জানতে পারলাম যুক্তরাষ্ট্রে করোনা মোকাবিলায় চলতি সপ্তাহে মার্কিন হাসপাতালে সরবরাহ করা হবে “রেমডিসিভির” নামক মহা ওষুধ। তা আবার পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন আক্রান্ত দেশে পাঠানো হবে। এই প্রক্রিয়ার কার্যকারীতা সুফল বয়ে আনুক এটাই সকলের প্রত্যাশা।

তবে ইতিহাস এটাই যে দূর্যোগ মোকাবিলয় মানুষ কিন্তু কোন ভাবেই হাল ছাড়ার পাত্র নয়। পৃথিবীতে যতো “অপশক্তি মহামারি প্রদাহের উৎপন্ন হয়েছে তা ধ্বংস করেছেন একমাত্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। আশা করি এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। মানুষের নিরলস শ্রম ও প্রচেষ্টা কখনোই ব্যর্থ যাই না। মহান সৃষ্টি কর্তার দয়া অবশ্যই মানুষের এই অস্থিরতাকে কমিয়ে শান্তি ফিরিয়ে দেবেন।

Karuna Acherjee probondha

তবে এবার মানুষ বিশেষ যেই ব্যতিক্রমী ঘটনার সাথে মোকাবেলা করছেন তা হলো এই করোনা ভাইরাস সংক্রমণে যাঁরা আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মৃত্যু বরণ করছেন তাদের যে করুণ পরিণতি তা বড়ই মর্মান্তিক। পৃথিবীর মায়ার বাঁধন যে এই ভাবে নির্বিচারে ছিন্নভিন্ন হবে তা কারো ধারনায় ছিল না। ভৌতিক পরিস্থিতিতে মানুষের কপালে এমন পরিণতি হতে পারে, যা আজ মেনে নিতে বড়ই কষ্ট হচ্ছে। সারা বিশ্বের মানুষের হৃদয় বিদারক কান্নার শব্দে পৃথিবীর ভারসাম্যও আজ ভারী হয়ে উঠেছে।

মৃত্যু কালে আপন জনের অনুপস্থিতি মনে হচ্ছে এই যেন তাদের সাথে ঘোর অন্যায় আচরণ করা। । কিন্তু আজ মানুষ এতোই নিরুপায় হয়ে পড়েছেন, যা আর কোন কালেভদ্রে হয়েছে বলে মনে হয় না।এটি ইতিহাসে আরো একটি কালো অধ্যায় যুক্ত হলো।

পৃথিবীর ঘটনা প্রবাহে যা সৃষ্টি হয় তা কালের সাক্ষী হয়ে বিবর্তন ঘটায়। কিন্তু বিশ্বের সব মানব জাতিকে একযোগে এমন মৃত্যু যন্ত্রণা উপভোগ করতে হচ্ছে যা দেখে মনে হয়, পৃথিবীতে এটি আর একটি পদাঘাতের চিহ্ন। তবুও মানুষকে মনোবল টিকিয়ে রাখতে হবে, বাঁচার লড়াইয়ে জয়ী হতেই হবে। এইভাবে ধৈর্যের পরীক্ষায় মানব জাতি বার বার সাক্ষ্য রেখে গেছেন।


বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় এই প্রার্থনা আজ সবাইকে করতেই হবে যে,
“বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা,
বিপদে আমি না করি যেন ভয়।
দুঃখতাপে ব্যথিত চিতে নাই বা দিলে সান্ত্বনা,
দুঃখে যেন করিতে পারি জয়।


বিশ্ব প্রতিপালকের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস শত দুঃখেও অটুট রাখা মানব জাতির পরম ধর্ম ও কর্তব্য।
আর এই দুর্দিনে মানুষকে অনুশাসন করার পরিবর্তে সহানুভূতিশীল হয়ে মানবতা ও মানসিকতার দীপ জ্বালাতে হবে। আজ যারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মৃত্যুকে উপেক্ষা করে নিরলস ভাবে করোনা ভাইরাস এর সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন তাদের প্রত্যেকের মনোজগতে এখন মানবতা আর মহানুভবতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। তাই মানবিক দৃষ্টিতে তারাই আগামীর ইতিহাসে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকবেন।

Karuna Acherjee probondha

Facebook Comments