Jongole kanu mama story bidyut bhowmik

বিদ্যুৎ ভৌমিক

পুজোটা আসতে যতটা দেরি , তার থেকে বেশি নানান রকম কিছু
কল্পনা – জল্পনা ! কিন্তু এত শিগগির যে হাওয়ায় হারিয়ে গিয়ে সেই
আনন্দটা মাটি হয়ে যাবে , ফুরিয়ে যাবে তার রেশ , এসব ভাবলেই
মনটা কেমন যেন অস্থির হয়ে ওঠে ! প্রত্যেক বছরই এমনটাই হয়ে
আসছে , তবে এবারটা একটু সামান্য ব্যতিক্রম — কাগজে, টিভি–
রেডিও – তে ফলাও করে প্রচার মহাশূন্য থেকে ভূগোল বইতে পড়া
নয়টা গ্রহের মধ্যে মঙ্গল অনেক কাছে চলে এসেছে ! এই খবরটা –
পাওয়া মাত্রই পৃথিবীবাসী ছাদে – মাঠে – বাড়ির বারান্দায় অনেক
রাত পর্যন্ত মঙ্গলকে দেখার ইচ্ছায় আকাশের দিকে তাকিয়ে ওরা নির্ঘুম রয়েছে !

পুজোর ছুটি ব’লতে কালীপুজো, এবং ভাইফোঁটার পর-পরই এই
ছুটির অবসান । বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজা, এসব কাটার পর মনটা উদাস হয়ে ছিল,
বাবা তো কতবার যে ধমক দিয়েছেন ,
ওরে অনেক আনন্দ করেছিস এবার বই-পত্র নিয়ে বোস !
” বাবার ধমক কান অব্দি পৌঁছালেও মনটা ব্যাজার করে বৈঠকখানা ঘরে বসে কতসব সাত-পাঁচ চিন্তা করছি ।
আমার ছোট ভাই বুম্বা টেবিল
চেয়ারে আমার পাশে বসে স্কুলের হোম টাক্স ইংরেজি এসে লিখছে
আর আমি অঙ্ক কষার খাতায় হিজিবিজি কাটছি । আমাদের এই
একতলার উঠোনে বড়দি – মেজদি – ছোড়দি গোল করে একটা —

জায়গায় বসে গানের লড়াই খেলছে । মাঝে মধ্যে ছোট আমাদের
ছোট জেঠামশাই মন্টু নিজের ঘর থেকে তারস্বরে চিৎকার করে
ওদেরকে বলেছেন, — তোরা এবার থামবি গোটা ঝিলবাগানটা
তোদের চিৎকারে — কি ভাবছে পাড়াপ্রতিবেশী ! থাম এখুনি, তা-
না হলে * ! মন্টুজেঠুর দাবড়ানিতে বড়দি – মেজদি – ছোড়দি
উঠোন থেকে এক দৌড়ে সোজা নিজেদের ঘরে মা-জেঠিমার পাশে বসে
লক্ষ্মীপূজোর নারকেল নাড়ু পাকাতে লাগলো । সবাই
এই নাড়ু করার সময় কোনো সারাশব্দ ও কথা বলে না । এটাই তো
এই বাড়ির ট্রাডিশন !

তখন সন্ধ্যা সাতটা হবে । হঠাৎ সদর দরজায় কলিং বেলটা বেজে
উঠতেই খাতাপত্র ফেলে এক ছুটে দরজাটা খুলে দিয়েই দেখি কি,
কানুমামা দাঁত বের করে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে ! আমি তো
বললাম, — কী ব্যাপার মামু হঠাৎ কী মনে করে ? কানুমামা তাঁর
সৌজন্য মাখা হাসি নিয়ে বাড়িতে ঢুকল । মামার ঠিক পেছনে পা
ফেলে – ফেলে এসে হাজির হলাম আমাদের ঘরে । মামাকে দেখে
মা- তো কেঁদে – কেটে একসা ! কতদিন পর এলিরে কানু, এতদিনে
বুঝি গরিব দিদিকে তোর মনে পড়ল ? মামা নিরুত্তর, কিন্তু লেগে
রয়েছে এক টুকরো মৃদু হাসি ওর ঠোটে । আমি বললাম, এবার —
কিন্তু তোমায় ছাড়ছি না মামু । গতবার এসে গল্প না বলে ফাঁকি
দিয়ে পালিয়েছো । এবার পালাও কি করে দেখব ।

Jongole kanu mama story

আমার পাশে বুম্বাও যে কখন নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে, সেটা একেবারেই টের
পাইনি আমি ! পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় ঝিলবাগানের আমাদের
কুসুমকুঞ্জের পেল্লাই বাড়িটা ঝলমল করছে । আমারা সবাই যে –
যার রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েছি । অনেক বায়না –
আবদারের পর বুম্বা আর আমি মামার পাশে শোয়ার জায়গাটা
পেলাম । কিন্তু শুলে কী হবে, ঘুম মোটেই আসছে না ! ফিস্ ফিস্
করে মামাকে বললাম, মামু তুমিতো জঙ্গলে – জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে
বেড়াও, দেখি একটা জঙ্গলের গল্প বল তো **** কানু মামাতো
পাশ কাটাতে পারলে বেঁচে যায়, কিন্তু আমাদের মতো দুটো বিচ্চু
ভাগ্নের বায়নায় শেষ পর্যন্ত নিম – রাজি হয়ে বলল, — ঠিক আছে
দাঁড়া বলছি, তবে একটার বেশি কিন্তু নয় । আমি বললাম, ঠিক
আছে একটাই হবে । গত বছর আমার পোস্টিং ছিল বিষ্ণুপুর —

ফরেস্টে । ওখানে ফরেস্টের কোয়ার্টারে আমার থাকার ব্যবস্থা
হয়েছিল । কিছুদিন ধরে একপাল হাতির তান্ডবে ওই অঞ্চলের
লোকজন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল ! কলাবাগান, ধানক্ষেত সবকিছু
ওই হাতি গুলো নষ্ট করতে লাগল ! আমাদের অফিসে সেই তাজা
খবর গিয়ে পৌঁছালো । ভাবলাম, হাতিগুলো খেত – খামার নষ্ট
করতে গিয়ে যদি মানুষ মারতে শুরু করে । কিম্বা ঘর বাড়ি ভেঙে
তছনছ করে ! তা-ই আগে ভাগেই কাজে নেমে পড়লাম । একদিন
ফরেস্টে অফিসিয়ালি কাজ মিটিয়ে আমার কোয়ার্টারে ফিরছি !
তখন নটা কি দশটা হবে । একটু অন্যমনস্ক ছিলাম । হাই রোড
দিয়ে বাইক চালিয়ে ফুল স্প্রিডে আসছি । হঠাৎ লোডশেডিং ।

চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার । নিঝুম নিরুত্তর পরিবেশ । দু’পাশের
গাছ – পাতাগুলোও বাতাসহীন নীরব স্তব্ধ হয়ে থম মেরে আছে !
হঠাৎ একটা ট্রাক এসে সজোরে আমার মটর বাইকটাকে মারল
এক ধাক্কা ! আমি এবং আমার বাইকটা দশ ফুট হাত দূরে রাস্তার
পাশে জঙ্গলে ছিটকে গিয়ে পড়লাম । আমার সেই সময় জ্ঞানটুকু
ছিল না ! পরের দিন সকালে আমার জ্ঞান ফিরল । চোখ মেলে —
তাকিয়ে দেখি, আমি হসপিটালের বেডে শুয়ে আছি ! ফরেস্টের
উচ্চপদস্থ কর্মি বলে বেশ খাতির – যত্ন হচ্ছে । ডাক্তার – নার্স সব
সময় যেন এঁটুলি পোঁকার মতো লেগে আছে আমার বিছানার সাথে !

আমাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে ! আমি ওকে বললাম, তুমি
যাকে কাল রাতে এনেছো তিনি ভালো আছেন ।
আমার কথা শুনে হাতিটা নীরবে শুঁড় দুলিয়ে –
দুলিয়ে মাথা – কান নাড়িয়ে চলে গেল ।
এরপর থেকে আমি ছুটি পাওয়ার পর দিন পর্যন্ত ওই দাঁড়ালো
হাতিটা প্রতিদিন সকাল – বিকেল আমাকে হসপিটালে দেখতে
আসতো !

কানুমামার মুখে এই ধরনের একটা গল্প শুনে আমি আর বুম্বা তো
অবাক ! মামা বলল, এই রাণা – বুম্বা এবার তোরা শুয়ে পড়, আর
গল্প নয়, কাল অনেক সকালে আমাকে উঠতে হবে । মামার কথায়
বুম্বা বাধ্য ছেলের মতো পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল । আমি আমাদের
ঘরের খোলা জানলা দিয়ে জ্যোৎস্না মাখা আকাশটাকে তাকিয়ে
দেখতে লাগলাম । চাঁদের আলো মাখা আকাশটায় সাদা কালো
বড়ো বড়ো মেঘ তখন উড়ে যাচ্ছে ! ওই মেঘদল যখন এক একটা
হাতি ওদের মধ্যে একটা হাতিকে আমি তখন আকাশপথে
খুঁজে চলেছি !!

জ্ঞান ফিরতে ডাক্তার বাবুকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি —
এখানে কীভাবে এলাম ? আমি আর বুম্বা কানিমামার গল্প শুনতে
শুনতে এক সাথে দুজনে বলে উঠলাম, — ডাক্তার কী বললেন ?
মামা বলল, ডাক্তার বাবু বললেন, আপনার যখন এ্যাক্সিডেন্ট হয়
জ্ঞান হারিয়ে অচৈতন্য অবস্থায় আপনি রাস্তার পাশের জঙ্গলে
পড়েছিলেন । ঠিক ওই সময় একটা দাঁড়ালো হাতি আপনাকে
দেখতে পায় ! ওই হাতিটা আপনাকে শুঁড়ে পেঁচিয়ে দু’কিলোমিটার
হেঁটে রাত দেড়টা নাগাদ এই হসপিটালে দিয়ে যায় ! আমরা সবাই
অবাক ! আপনার পকেট হাতড়ে আপনার পরিচয়পত্র জানতে
পেরে আপনাকে সঙ্গে করে এ্যাডমিট করে নিয়েছি । হাতিটা সারা
রাত হসপিটালের গ্রাউন্ডেই ছিল । সকাল হতেই দেখি হাতিটা —

Jongole kanu mama story bidyut bhowmik

Facebook Comments