desh premer kobita fariduzzaman

বাউলিয়ানা
ফরিদুজ্জামান

প্রকাশকালঃ ১৫.০৯.২০২০

ঘুণধরা বাঁশে তৈরি ঘর বোশেখ ঝড়ে ভেঙে পড়লে-
বাউল মনে আনন্দ প্লাবন। বাউল বাস্তুচ্যূত হলে হিসেবিরা হাহাকার করে, গভীর আনন্দ স্রোত কেউ দেখে না।
কামিনীর গন্ধ ভরা স্নায়ুঝড়ের সপ্তর্ষি ব্যাকরণ মানে না।
নেশাভরা নিশাচর ব্যাকরণ ভেঙে ভেঙে অলঙ্কার গড়ে
কেবল ঠিকানা খোঁজে অচিন নেশায়।
লোকে কলঙ্ক দেয়-নিন্দা জানায়, অথচ নিন্দার কাঁটা
ফুটে প্রেম ধর্ম বাঁচে। লৌকিক পাঠ নিয়ে লোকে ভাবে
জন্মরং অন্ধজন বুঝি, পথ সংকেত না বুঝে পথ হাতড়ায়, ওরা জানে না কবিমনে অজস্র রঙের খেলায় গভীর আনন্দ বারতা।
মায়ের আঁচল ছোঁয়া মমতার স্বাদ দোলনায় দুলে দুলে তার মুখের বোল কথক পাখির সুরে কবি কণ্ঠে বাজে।
রুপোলি জ্যোৎস্না রাতে মায়ের কণ্ঠের সেই ঘুমপাড়ানি
গানের অনুধ্বনি বাজে তার প্রাণে।
পার্বণে পিঠায় নকশি তোলার ফাঁকে একান্ত আদরমাখা
গল্প-রূপকথায় ভিতর পাখির ভিন্ন অভিষেক।
বসন্তে বনজের বর্ণিল উদ্দামতায় অনন্তের আকাক্সার
সুর মূর্ছনায় বাউলিয়ানার জীয়ন জনম।

কৈশোর
ফরিদুজ্জামান

বিল ঝিল সাঁকো নানা রঙে আঁকো দুরন্ত ছেলেবেলা
পূজা পার্বণ ঈদ উৎসব আড়ং জমেছে মেলা।
দিগন্তজোড়া খেসারির ক্ষেতে তোমাদের লুকোচুরি
চঞ্চল পায়ে লাটাই সুতোর উড়ায়ে চলেছ ঘুড়ি।
জীবনের মানে আবিষ্কারের নেশায় বিভোর চোখ
হাসি খুশি বান আনন্দ গান দূরে ঠেলে দিছো শোক।
স্নেহের আশীষ আদরের শিস শ্যামল মাঠের ডাক
আলিঙ্গনের কাঁপা কাঁপা বুকে ঘুচে যায় রাখঢাক।
শুধু অনাবিল শান্তির ঢেউ কৈশোর প্রচ্ছদে
জীবন ভরবে কানায় কানায় মণি মাণিক্য হ্রদে।
গঞ্জ ও গাও কুড়ানীর বাও ঝিলমিল ঢেউ খেলে
চান্নি পরশা কুয়াশা চাদরে রূপে রসে সুখ মেলে।
ষড়ঋতু জুড়ে নানান ছন্দে জগতের সংগীত
আনন্দ রসে জীবন তৃষ্ণা কৈশোর রচে ভিত।

একটি জাতির স্বর
ফরিদুজ্জামান

প্রকাশকালঃ ২৮.০৮.২০২০

ভিনদেশী ভাষা গিলে খেয়েছিল বাংলার অক্ষর
করপোরেটের দালালরা দিতো বৈধ্যতা ম্বাক্ষর।
পরগাছা খেত পাতা ফুল ফল আমের ফলন জিরো
স্বার্থণ্বেষী পা চাটা কুকুর প্রচারে জাতির হিরো।
পরতে পরতে বাসা বেঁধে ছিলো কুসংস্কার ভূত
কূপমণ্ডুক বোধে শান দিতো পাকিস্তানের পুত।
আপন ঘরের বাঁধন কাটতো কুলাঙ্গারের দল
মা মাটি মানুষ লুণ্ঠিত ছিল আশ্রয় করে ছল।
দানব রাজ্যে বিরল মানব দৈত্য দানোরা ঘুরতো
গ্রহণের কালে ম্লান ও ফ্যাকাসে জয় নিশান উড়তো।
মনে পড়ে যায়- হাজার লড়াই ভাষার আন্দোলন
অকুতোভয়ের মহান মুক্তি যুদ্ধ জয়ের ক্ষণ।
মনে পড়ে যায় বুকের শোণিতে বর্ণমালার ধারা
নাভিমূলে বাঁধা বাঙালি চেতনা চারিয়ে দিয়েছে যারা।
মনে পড়ে যায়-শহিদের কথা আত্মার আত্মীয়
রফিক-শফিক-সালামের তেজ চিরকাল ব্যাপী জিও।
মনে পড়ে যায়-রক্তরাঙানো বাংলা বর্ণমালা
জগদ্দলের বরণ মালাটা ধ্বসে যাওয়ার পালা।
মনে পড়ে যায়-সাতই মার্চের মুক্তিমন্ত্র স্রোত
মনে পড়ে যায়-একটি আঙুলে স্বাধীনতা উদ্যত।
মনে পড়ে যায়-একটি ভাষণ একটি জাতির স্বর
বুকের মধ্যে সদা জাগরিত একজন মুজিবর।

বায়েস্কোপের পদ্য
ফরিদুজ্জামান

বায়েস্কোপের আগমনের ঝুমঝুমাঝুম শত
মনটা আমার কেঁড়ে নিতো হেমিলনের মত।
ভোঁদৌড় দিয়ে জড়ো হতাম ছেলেছোকড়ার দল
বায়োস্কোপের ছবির নেশায় বাড়তো মনোবল।
একটি সিকির বিনিময়ে নানান বরণ ছবি
দেখে নয়ন ভরে যেতো গীতিময় তার সবই।
চোখের তৃপ্তি কানের তৃপ্তি মনের তৃপ্তি নিয়ে
কিশোর বেলার মনের জগৎ ভরতো যে সুখ দিয়ে।

ছোট্টবাক্সে ঘোড়া হাতি দালান কোঠা দেখে
বিস্ময়ে খুব আলোড়িত হতাম পড়া রেখে।
ভাবনা নদীর নৌকা বাওয়ায় পড়তো নাতো যতি
মনের ভেতর উথাল পাথাল স্বপ্নে নয় বিরতি।
বাদ্য সুরে গীতে বয়ান ফুটতো দৃশ্যপট
কল্পনাতে ভরতো আমার কাব্যরসদ ঘট।
ছোট্টোবেলায় রঙের মেলায় বায়েস্কোপের স্মৃতি
জীবনমাঠে সোনার ফসল গোলায় ওঠায় প্রীতি।

স্বাধীনতার অমর কাব্যের কবি
ফরিদুজ্জামান

মুক্তির সংগ্রামে আদর্শের মৃত্যুপণ করেছো লড়াই
শেষ রক্ত বিন্দু ঢেলে মা মানুষ মৃত্তিকার ঋণ শোধের চড়াই উৎরাই।
সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর ভালোবাসার কাঙাল ছিলে তাই বাঙালীর মঙ্গল সাধনা
জীবনের চেয়ে বড়ো তোমার তেজদীপ্ত ধ্যান আর সম্মাননা।
পৃথিবীর ইতিহাসে তোমার সমকক্ষ কোন্ বীর হলো মহীয়ান?
অন্যায়কে স্তব্ধ করতে শিরস্ত্রাণ দেওয়ার আগে প্রস্তুত ছিলে দিতে প্রাণ বলিদান।

ধনলোভে-রাজ্যলোভে ইতিহাস জুড়ে কতো লুণ্ঠন অধ্যায়
পালাক্রমে ফিরে আসে বাংলাদেশের বুকে ছুরির ফলায়।
শত্রুকে হটিয়ে দিয়ে ভাষারাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছিল প্রাণের শপথ
বীরের উত্তরসূরী ক্ষিপ্র পায়ে চলা তোমার একমাত্র পথ।
জনগণ বুঝেছিল দখলদারের মিছে জারিজুরি
কতো আর স্তব্ধ রাখে জনরোষে চালিয়ে সে চাবুকের তুড়ি।

মঙ্গা মন্বন্তরে অযুত জনতা মরে দুর্গের ভেতরে চলে রাশ উৎসব
বিভীষণ মননে তবু সম্রাটের দখলদারের ভক্তিবাদ শ্রদ্ধাভরে করে কলরব!
প্রাসাদ ষড়যন্ত্র দেখে মেকি জগদ্দল উল্টাতে দ্রোহ আসে মনে
তুমিই রাখাল রাজা লক্ষ মুজিব তেজ দিলে ভীম রণাঙ্গনে।
দখলদারের কথাই আইন এতো ঘৃণ্য স্বৈরাচার এ কোন বিচার?
কেনইবা মানবে তা বঞ্চিত জনতা এমন আচার!
দখলদার কেনো হবে জনতার প্রাণপ্রিয় বিধাতা পুরুষ?
শোণিত সমুদ্র তীরে কেনোইবা করবে তাকে জগৎ সুরুজ!
এইসব ভাবনায়- মা মানুষ মৃত্তিকার ঋণ মনে পড়ে যায়
তবু মনে হয়- রক্ত যা ঝরে তাতো ন্যায় যুদ্ধই ঝরায়।

রণক্ষেত্রে বীরযোদ্ধা ত্রাণকর্তা মহা-অধিপতি
তুচ্ছ করে মৃত্যুদণ্ড মুক্তির পতাকাবাহী দৌড়ে বাড়াও গতি।
প্রাসাদ ষড়যন্ত্রগুলো রক্তের বন্যায় ভাসে ঠিক
তোমার মন্ত্রণা পেয়ে মৃত্যুপণ যোদ্ধা ছিলো রণক্ষেত্রে অভীক।
জগদ্দল সরালে তাই বুকে রাখি জ্বলজ্বল তোমার জীয়নকাঠির ছবি
বাংলাদেশে অভ্যুদয়ে বিপ্লবের পথে হেঁটে তুমি আমার স্বাধীনতার অমর কাব্যের কবি।

desh premer kobita fariduzzaman

মিরাকেলে ভাষণ
ফরিদুজ্জামান

মিরাকেলে বক্তৃতাতে এটম বোমায় শক্তি তাতে
জড়ো করে বঙ্গবন্ধু দিলেন মুক্তির ভাষণ
যা শুনেই পাক শাসকের চমকে পিলে আসন।
শুরু করে জেনোসাইড কুচক্রীরা মিলে
পোড়ামাটির নীতির বলের খাবে সবই গিলে!
মুক্তি পাগল মুক্তিসেনা রক্ত ঢেলে চুকিয়ে দেনা
ত্রিশ লক্ষ শহীদ শেষে ফিরল দেশে গাজীর বেশে।
বিশ্বম্যাপে বাংলা স্বাধীন বীররসে তাধিন তাধিন
সেই থেকে এই এটম ভাষণ বুকের ভেতর নিল আসন।
বিশ্ব জুড়ে নন্দিত আজ ওয়ার্ল্ড হেরিটেজে
আর যাবে না মোছা তাকে ভাওতারই ইরেজে।
শোষণ নাশের শক্তি আনে ত্রাষণ ভাঙার ভক্তি বাণে
ইউনেস্কোর মাস্টার পিস মুক্তিরই ইমেজে।

ধন্বন্তরী ভাষণ
ফরিদুজ্জামান

ঐতিহাসিক এমন ভাষণ দ্বিতীয়টি নেই
একটি জাতির জন্মকথার অনিবার্য এই।
ভাষা-জাতির ক্রান্তিকালের এই ভাষণটি সূর্য
আকাঙ্ক্ষারই মূর্ত প্রতীক মুক্তিযুদ্ধের তূর্য।
এই ভাষণটি বুকের শক্তি আম্রকানন বন
বীরের সাহস যুগিয়ে চলার সুধা সঞ্জীবন।
এই ভাষণটি চন্দ্রাহতের যুদ্ধে সমর্পণ
অকাতরে জীবন দানের মন্ত্র মৃত্যুপণ।
এই ভাষণটি অমানিশার কালো রাতির বাতি
শোষণ ত্রাষণ রক্তে রাঙ্গা ইতিহাসের সাথী।
এই ভাষণের বিস্ফোরণে ভাঙ্গে অধীনতা
এই ভাষণের অমোঘ মন্ত্রে পেলাম স্বাধীনতা।
মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ডে তাই এ ভাষণটির ঠাঁই
ইউনেস্কোর ধন্বন্তরী আদর্শের তেজ পাই।

বৈতরণীর নেয়ে
ফরিদুজ্জামান

বাবার ভিটায় বেড়ে ওঠা একটি মেয়ের কথা
কাদা জলে গড়া মনে দেশের কথকতা।
মধুমতির জল টলমল স্নিগ্ধ স্রোতধারা
সবার মনে বইয়ে দিতে হলো পাগলপারা।
বললো বাবা- ভবিষ্যতটা পথের কাঁটায় ভরা
তাই তোমাকে হতে হবে বজ্রদিয়ে গড়া।
বাঁচার লড়াই জেতার যুদ্ধে জুটেছিলো সাথী
দেশ বাঁচাতে দৈত্য তাড়ায় ঘোচায় অমারাতি।

জন-জোয়ার উছলে দিতে ঘুরলো মাঠেঘাটে
সুখ শাওরের স্নাননদী ছড়ায় দুখের হাটে।
শয়ন স্বপন জাগরণে তেজী বুকের পাটা
যুগ জাগরণ ঘটায় মেয়ের রক্ত মাখা হাঁটা।
স্বজনহারা সবার স্বজন মায়ায় মাখামাখি
দেশের কাজের আকুল প্রেমে বোজে না তার আঁখি।
স্বপ্ন যে তার দোয়েল কাঁঠাল শাপলা ভরা বিল
শোষণ পীড়ন উৎপাটনের সাধন অনাবিল।

রক্তনদী পাড়ি দিতে প্রস্তুত হলো মেয়ে
তার মনে তাই উঁকি দিলো দেশ চালানোর নেয়ে।
রক্তনদী বয়ে এলো লাল সবুজের রবি
মানচিত্রের দানে বাবা স্বাধীনতার কবি।
বাংলাদেশের পতাকাতে বাবার প্রতিচ্ছবি
তবু ঘাতক কেড়ে নিলো জাতির সেরা সবই।
বাবার খুনের ঋণ শুধিতে চলছে হেঁটে মেয়ে
সবাই বলে বাংলা মায়ের বৈতরণির নেয়ে।

মুজিব বর্ষ
ফরিদুজ্জামান

মুজিব বর্ষ
সজীব হর্ষ।
সুখের স্পর্শ
দুখের ভষ্ম।
স্বাধীনাদর্শ
হবে নমস্য।
জাতির উৎকর্ষ
শুভে আকর্ষ
অশুভে ঘর্ষ
দূরে বিমর্ষ
মুজিব বর্ষ।

বাঙালি জাতির ত্রাতা
ফরিদুজ্জামান

বাঙাল ঠোঁটে হাসি ফুটুক লড়াই তোমার কায়মনে
সুখ সমৃদ্ধি এনেছিলে মেহনতীর জীবনে।
শয়ন স্বপন জাগরণে জনক তুমি নিবিষ্ট
স্বাধীনতা অর্জন এবং সুসংহত অভিষ্ট।
পদানতের গ্লানি মুছে মর্যাদারই উচ্চশির
তোমার দানে বাঙালি আজ বিশ্বসেরা স্বাধীন বীর।

তোমার ডাকে মুক্তিসেনা রণাঙ্গনে মৃত্যুপণ
মুক্তি পাগল খুন ঢেলেছে পতাকাতে অগণন।
মানচিত্র ও জয় নিশানে তোমার প্রতিচ্ছবি
পিতা মুজিব স্বাধীনতার জীয়ন ত্রাতা কবি।
সপরিবার আত্মদানে অবিনাশী বরাভয়।
রাখাল রাজা বোধ মননে চিরদিনই জেগে রয়।
বাংলাদেশের শিরায় তোমার শোণিত প্রবহমান
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বদলা
ফরিদুজ্জামান

কারবালারই মহাকাব্য
আশা ছিল রচিবার।
অপূর্ণতায়ই মধুকবি
জীবনটা করলেন পার।
বাংলাদেশের মহাকাব্য
লিখছেস লক্ষ কবি।
অাগস্টের ট্রাজিডিই
মহাকাব্যের ছবি।
শোকের মাতমে মুক্তি নয়
শোককে শক্তি করে-
এজিদের পরাজয় ঘটিয়ে
দানবকে ঝোলায় ভরে।
পিতৃহত্যার বদলা নেবো
সোনার বাংলা গড়ে-
এই চেতনা ছড়িয়ে পড়ুক
বাংলার ঘরে ঘরে।

চেতনার ঢেউ-১
ফরিদুজ্জামান

লোকটার দেহখানা পড়েছিলো সিঁড়িতে
মৃতপুরী সেজেছিলো বীভৎস্য ছিড়িতে।
লোকটার বুকখানা গুলি খেয়ে ঝাঁঝরা
লোকটার ছেলে বৌ’র উড়েছিলো পাঁজরা।
লোকটার বাড়িটার বুকে ক্ষত জমেছে
লোকটার দেশটার দুখ কতো কমেছে।
লোকটার চোখে ছিলো খুব দূরদৃষ্টি
লোকটার হাতে হলো দেশটার সৃষ্টি
লোকটা কি আমাদের সমাজের কেউ না
লোকটা কি আমাদের চেতনার ঢেউ না !

desh premer kobita fariduzzaman

চেতনার ঢেউ-২
ফরিদুজ্জামান

বলি নাই বলবো না শুধি জমা ঋণ
বলার ক্ষমতা নাই আমি দীনহীন
লিখে যতো শোধ করি বিন্দু
শতগুণ বাড়ে মহাসিন্ধু
শত্রুকে দহ তুমি
পরিচয়বহ তুমি।
ত্রাতার অতুল তুমি
পতাকার মূল তুমি।
তোমার রক্ত ঋণে
বুকে ব্যথা চিনচিনে ।

যতো শোধ করি ঋণ
ব্যথা ততো হয় লীন।
তুমি ছাড়া আমাদের নাই আর কেউ
জাতির মনন তুমি চেতনার ঢেউ।
আমাদের খুনে বহা বোধনের মিতা
জাতির জনক তুমি বাঙালির পিতা।

মানবসূর্যের কল্লোলিত ঝর্ণাধারা
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস
ফরিদুজ্জামান

একটি মুক্ত সকাল দেখবে বলে তোমার ডাকেইতো ত্রিশ লক্ষ মানুষ বিলিয়ে দিল জীবন। সম্ভ্রম হারাল আড়াই লক্ষ মা-বোন। তুমি ফিরে আসছো স্বাধীন বাংলাদেশে। জাতি রাষ্ট্রের সৃষ্টির পর অধীর আগ্রহে সবাই প্রতীক্ষ্যমান। বাংলাদেশের পতাকায় তোমার প্রতিচ্ছবি উড়ছে পত্পত। সাড়ে সাত কোটি দেশবাসীর ভালবাসার প্রতীক জ্বলজ্বল করছিল সুনীল আকাশে। এক সাগর রক্ত পেরিয়ে বাংলার ধ্বংসস্তূপে জন্মেছিল লক্ষ কোটি স্বপ্ন কোরক। প্রিয়হারা নর নারী তোমার উদার বুকে ঠাঁই পেতে উদগ্রীব হয়ে চোখে মুখে এঁকেছিল আকুলতার বলিরেখা। হাজার বছরের পরাধীনতার শিকল ভেঙ্গে মুক্তির আনন্দময় উচ্ছলতা ছড়াচ্ছিল জ্যোতি।

বায়াত্তরের দশ জানুয়ারী তোমাকে নিয়ে বিশেষ বিমানটি যখন তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণ করল তখন আনন্দের ঝর্ণাধারায় সিক্ত হল বাংলার তৃষ্ণিত বুক। তুমি হাসিমুখে হাত নেড়ে সমবেত জনতাকে অভিবাদন জানালে । উল্লসিত সবাই করতালি আর জয় বাংলা ধ্বনিতে মুখরিত করে তুলল আকাশ বাতাস। সকলের চোখেই তখন আনন্দের অশ্রু। হে মানবসূর্য, বাংলাদেশের স্থপতি তোমার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পুনর্মিলন আজও বাঙালির আনন্দ আর আবেগের কল্লোলিত ঝর্ণাধারা।

আপনার চেয়েও আপন এমন জন কি আর ফিরে পাব রে!
আমাদের অজপাড়া গাঁয়ে দুই পাড়া মিলে সে সময়ে রেডিওর সংখ্যা ছিল ৪টি। আমি তখন ক্লাশ ফাইভের ছাত্র। ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট আমি যথারীতি গ্রামের সরকারী ফ্রি প্রাইমারী স্কুলে এসে উপস্থিত হই। দেখলাম-স্কুল সংলগ্ন বাড়ির চাঁন মোল্লা সাহেব আমাদের হেড স্যারের পাশে বসে বিশালাকার রেডিওর সাথে কান লাগিয়ে খবর শুনছেন। বঙ্গবন্ধু নেই, এমন গুঞ্জরণে চোখে মুখে তখন বিষাদের ছায়া।

desh premer kobita fariduzzaman

আমারা ক্লাশ ফাইভের ৭/৮ জন ছাত্রছাত্রী অসীম শোকে মূহ্যমান। সকাল ১০টা বাজতে তখনো মিনিট পাঁচেক বাকি রয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে হেড স্যার কান্না জড়িত কণ্ঠে স্কুল ছুটির ঘোষণা দিলেন। তিনি বললেন– শেখ সাহেব সপরিবারে নিহত হয়েছেন। ঢাকার পরিস্থিতি ভাল নয়। দেশ স্বাধীন থাকবে কিনা খোদা মালুম। সেনা শাসন জারী করা হয়েছে। আমরা কয়েক জন হতভম্বের মত মাথা হাত দিয়ে বসে আছি। চাঁন মোল্লা সাহেব বলতে লাগলেন দ্বিতীয় কারবালা হয়ে গেল। আমাদের নাম নিশানা মুছে যাবে নাতো? আমি স্কুল থেকে বের হয়ে বাড়ির দিকে রওণা দিলাম। মনে অনেক কথা বাজতে লাগল। মুক্তিমুদ্ধের কালে পালিয়ে বেড়ানোর স্মৃতি স্মরণে বিষাদগ্রস্থ হয়ে আমার পা চলছে না।

ধীর পথচলার মধ্যে কতো কথাই না মনে ভেসে উঠল। বঙ্গ বন্ধুকে সত্তরের নির্বাচনী জনসভা দেখতে পারি নি। সেই দুঃখবোধ একটা বিশাল শোকের ঝাপটা এসে ঢেকে গেল। মনে হচ্ছে এক দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছি। মনে সত্তরের নির্বাচনী জনসভায় না যেতে পারা স্মৃতি ভেসে উঠল। মহারাজপুর ইউনিয়নের বনগ্রাম গ্রামের আমার খালা বাড়ি। কুমার নদের তীর ঘেঁষে বনগ্রাম ও আমাদের গ্রাম। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু বনগ্রামে সভা করতে এসেছিলেন।আমাদের গ্রাম থেকে অনেকে সে সভায় যোগ দিয়েছিল।আমার এক জ্ঞাতি ফুফু এসে বললেন-মজিবর রাজা হবে আজ বনগ্রামে আসবে, তাই নৌকায় মাইকিং হচ্ছে। মাইকিংয়ের শব্দ শুনে আমি ভোঁ দৌড়ে নদীর পাড়ে হাজির হলাম।শুনলাম বঙ্গবন্ধুর বনগ্রামে আসার বার্তা।

আমি তখন গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাশ ওয়ানে পড়ি।মায়ের কাছে বায়না ধরলাম বনগ্রামে খালাবাড়ি বেড়াতে যাব। প্রবল আশা ছিল বেড়াতে গেলে বঙ্গবন্ধুকে দেখতে পাব। মা বললেন নৌকা ভাড়া করতে পারলে যাবেন। কিন্তু কোন নৌকা পাওয়া গেলনা। আমার আর বঙ্গবন্ধুকে দেখা হল না।তবে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মহারাজপুর ইউনিয়নের বনগ্রাম মাঠে এসে নির্বাচনী জনসভা করেছিলেন।ছোট বেলা থেকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কতো গল্পইনা শুনেছি। তার ভেতর ন্যাড়ার বটতলায় যাওয়ার গল্পও মনে উদয় হয়ে আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখল। মনে পড়তে লাগল- তখনও আমাদের গ্রাম্য বাজার জমে ওঠেনি। নদীপাড়ের বটতলায়ই নরসুন্দরগণ বাক্স নিয়ে বসতেন।

ধীরেণ দাদুর কাছে আমরা দুই সহোদর চুল কাটাতে যেতাম। ধীরেণ দাদু তাঁর দুই হাঁটু দিয়ে মাথাকে আঁকড়ে ধরে মাথা বেল বানিয়ে দিতেন। মাথা কাটার ভয়ে আমি যারপর নাই শঙ্কিত থাকতাম। তবে ধীরেণ দাদুর বিবিধ গল্পের মোহে আমরা বার বার ফিরে যেতাম তাঁর বটতলার দোকানে। দাদুর একটা গল্প খুব মনে পড়ে। তাঁর দুই হাঁটুর মধ্যদিয়ে বেরিয়ে আসা রথী মহারথীদের নাম শুনে আমরা অভিভূত হতাম।

দাদু গর্ব ভরে গল্প করতেন-তিনি নাকি মহাত্মা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধুরও নরসুন্দর ছিলেন। বলতেন- এই রত্নধারী হাঁটুদ্বয়ের মধ্যদিয়ে বেরিয়েইতো মহাত্মাগণ দেশ সৃস্টি করলেন।এ মহাত্মাদ্বয়ই আজ নিহতের তালিকায়। স্কুল থেকে আমি বাড়ি ফিরে আব্বার কাছে বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নিহত হওয়ার সংবাদ দিলাম। আব্বা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। খানিক ক্ষণ নিস্তব্দ না পর হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন। বলতে লাগলেন-আপনার চেয়েও আপন এমন জন কি আর ফিরে পাব রে!

desh premer kobita fariduzzaman

Facebook Comments