BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW

সত্যি কথা বলতে কি, আমার কবিতা সম্পর্কে কিছু বলার বা নিজের কাব্যময় অনুভব নিয়ে বলতে বড়ই দ্বিধা জাগে । আসলে এই ব্যাপারটা অনেকটাই মায়াদর্পণ, অর্থাৎ ম্যাজিক রিয়ালিটি ” বলা যেতে পারে । এই দর্পণে উকি দিয়ে দেখলে কত অলীক কিছু আমরা খুঁজে পাই । অক্ষরে অক্ষরে কতযে জড়ানো বিলাপ । তাই কবিতার প্রতি আভূমি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতেই হয় । কবিতা আমার নিজের প্রাত্যহিকতাকে তছনছ করে, চুরমার করে । সহজভাবে চলতে – চলতে কবিতা মানুষকে বেসামাল করে দেয় । একটা ভাল কবিতা পড়লে মন অনাস্বাদিত আনন্দে ভরে যায় । আমি মনে করি, এই ভালো লাগার একটা অদৃশ্য চাপা উত্তেজনা ও অস্বস্তি থাকে । তবে কি, আমি আদ্যোপান্ত ভাবে মনে করি — আমারা এই অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতে চাই না । একটা ভালো কবিতার জন্ম হয় আসলে মেধা ও আবেগের মিলিত রসায়ন থেকেই । শুধু আবেগ কবিতার সংহতিকে নষ্ট করে । আর মেধা নির্ভর কবিতা হৃদয়কে স্পর্শ করেনা । চেনা, জানা – দৃশ্য যিনি মৃদু উত্তেজনায় ফুটিয়ে তোলেন তাঁর কবিতায় থাকে আলোর কারুকাজ । আমি খুব সতর্ক থাকি যখন কলম নিয়ে বসি কিছু একটা লেখার জন্য ।

কবিতার জন্ম হয় না, আবির্ভাব হয় বলতে পারি । কবি অনেকটাই নিভৃতচারী, মনন ও তাঁর জীবনধর্মী চেতনাকে নিরন্তর লালন ও পালন করে আসছেন যুগ যুগ ধরে । তার ফল সরূপ শব্দের কারুকার্যখচিত ভাব – ভাবনায় গড়া কবিতার প্রকাশ হয় । আবার বলছি কবিতার জন্ম হয় না । আমি ৭০ – এর দশকের কিছু পর থেকে কবিতা লিখছি । আমি বিশ্বাস করি না, সত্যকে স্বরচিত সুন্দরের খামের ভেতর পুরে রাখতে চাই না । তবে রাখা বা না রাখার ব্যাপারে বিশ্বাস ~ অবিশ্বাসের দোলাচল, ঐতিহ্য ও সংস্কারের মান ভঞ্জন, বিষয় না বিন্যাস — মেধা না কেবল মনন — হৃদয়ে হৃদয় খোঁড়া — প্রবাহ জোড়া কেবলই একলা হতে থাকা, নিঃস্ব । একটা বিশেষ সত্যি কথা হল, — আমি মদ না ছুঁয়েও মাতাল । আসলে কি, যে নেশা আমি ৩০ /৩৫ বছর ধরে প্রতিনিয়ত করে চলেছি তার মায়াময় অনুভূতি আমি ছাড়া অন্য কেউ অনুধাবন করতে পারবে না ।

BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW

BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW
Bidyut-bhowmik

সত্যি বলতে কি , আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি কোনো কিছু লিখতে যখন বসি সেই মূহুর্তে আমি-কিন্তু পরিকল্পিত ভাবে চিন্তা ভাবনা করে সেই লেখা লিখি-না । লেখাটা আল্লার বলুন কিম্বা ঈশ্বরের আশীর্বাদে হয়ে যায় , এটুকুই বলতে পারি । এটা আমার
বহু বছর ধরে চলে আসছে । মোহহীনতাই একজন কবি ও লেখককে সঠিক সন্মানের রাস্তা দেখায় , তাই না ? আমি আমার কাব্যজীবনের চল্লিশটা বসন্ত দেখলাম , আত্মস্থ চেতনার তাগিদ ছাড়া আমার কাছে সময়ের অন্য কোনো প্রেরণার মূল্য নেই বলা যায় । বাংলার পাঠক কবিতার সাথে-সাথে আমাকে প্রকৃত-অর্থে চিনে ফেলেছেন । আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি— মহৎকবির লক্ষণই হল নিজের কবিতায় আত্মস্থভাবের আবিষ্কার করা, এবং তাতেই পূর্ণ অভিনিবিষ্ট হওয়া । এই প্রেরণা-ই আমাকে দিয়ে শুধু কবিতা লিখিয়ে নিয়ে চলেছে ! তাই কোনো লোভের দিকে এই চোখচুপ সরলতায় তাকাবার প্রয়োজন বা ইচ্ছা কখনোই কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকের হয়-নি এবং হবে-না , এটা জোর গলায় বলতে পারি । আরও পরিষ্কার করে যদি বলি , কোনো কাগজের চাহিদা মেটাতে বা যুগের আবহাওয়ায় নিজেকে বহতাময় স্রোতে ভেসে যেতে দিতে পারি না । অর্থ সাধনায় ব্রতী হই-নি ও হব-না । আমি আমাকে একেবারে নিঃসঙ্গ রেখে ধীরে ধীরে এগিয়েছি ,কোনো চোটুল প্রলোভনে কখনো আমার ধ্রুব বিশ্বাস থেকে এক বিন্দু-ও সরে আসি-নি , খ্যাতির জন্য কোনো কৌশলী প্রচেষ্টা কোনোমতে চালাই-নি । তাই তো কবিতাপ্রাণ পাঠকসমাজের মুখে মুখে সেই যে আমার সেই বিখ্যাত কবিতার অমোঘ পংক্তি শুনতে পাই যে পৃথিবী ভেজার কথা / সে পৃথিবী ভেজেনি”! এই ধ্বংসের মারমুখী সময়ে কবিতার কতটা প্রয়োজন আছে ? এটা আমিও অনেকবার আমাকে প্রশ্ন করেছি ।

ডারউইনের বিবর্তনবাদে বাঁদর থেকে মানুষে রূপান্তর হলেও এই মানুষের মনোবৃত্তি ,হিংসা-দ্বেষ-পরশ্রীকাতরতা যে সহজে যাওয়া-র নয়! পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এখনো সনাতন ধর্মের অভিশাপ, জাত-প্রথার আচরণ বিধি স্তম্ভিত করে রাখে । অথচ আমরাই উপগ্রহ নিক্ষেপণ করি বহিরাকাশে! এটা আমাদের লজ্জার ! এই জন্যেই কী এতো কবি- শিল্পী এবং সাহিত্যিকের জন্ম , কী করতে পারেছি আমারা ? এই পৃথিবীটাকে ভালোভাবে রাখতে পেরেছি, না আমারা ভালো আছি, বলুন ? এসব চিন্তা করেই আমার কাব্যগ্রন্থ কথা না রাখার কথা” লিখেছিলাম ! আমি কবিতা-কে সঙ্গে নিয়ে হাঁটি চলি, কথা বলি ! এ কথা আমি এর আগে আমার কবিতানির্ভর বহু সাক্ষাৎকার-এ বলেছি ।

BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW

কবিতাচর্চাতো সাহিত্য ও ভাষা চর্চার নামান্তর । আমাদের সৃষ্টির ও সংস্কৃতি মেধা মননের এবং কল্পনা ও উদ্ভাবনী শক্তির প্রয়োগ ঘটে সেখানে । কিন্তু অন্যদিকে এটা আবার দুঃখেরও সংবাদ ! দুঃখ এই কারণেই যে , যেভাবে লেখক সংখ্যা বাড়ছে সেভাবে কি পাঠকও তৈরি হচ্ছে ? আমি মনে করি , কবিতার নির্দিষ্ট কিছু
সংজ্ঞা নেই , ব্যক্তিগত ধারণাতেই কবিতা সঞ্জীবিত । কবিতা মানুষের জীবন ধারণের সামগ্রী না হলেও বেঁচে থাকার কিছুটা অবলম্বন-তো বটেই । এটা একটা বহমান প্রবাহ । বাংলা কবিতা নিয়ে যে পরীক্ষা নিরীক্ষণ চলছেই তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই বলেই চলে । তবু বেনোজলে আমাদের বোধ ভেসে
যাচ্ছে , অনেক লেখা পাতে এসে পড়েছে , কিন্তু অখাদ্যের কারণে মননে পৌঁছাচ্ছে-না ! যে হারে কবিতা ও কবির সংখ্যা দিন-দিন বাড়ছে , তাতে ভালো বা প্রকৃত কবিতা লেখা বাড়ছে-না ! সাহিত্যে আনন্দের ভোজে প্রকৃত মগ্ন পাঠককে অধিকাংশ সময়েই উপোস দিতে হচ্ছে ! আমি বিশ্বাস করি ; আমার সময়ের সঙ্গে কবি বিষ্ণু
দে ও বুদ্ধদেব বসুর কালের এই যে গুণগত পার্থক্য , এর জন্যই সম্ভাবত –
কবিতা – পত্রিকার সমান্তরাল ইদানিং আর কোনো পত্রিকা নেই বাংলা ভাষার । অবশ্য এর মধ্যে অনেক বৃদ্ধি ও প্রসার পেয়েছে কবি যশো প্রার্থীর সংখ্যা ! কিন্তু কবিতা তো কেবল কবিতা ছাপানোর কাগজ বা পত্রিকা ছিল না । কবিতা
ছিল সত্যিকারের কবিতার জন্য নিবেদিত পত্রিকা । রবীন্দ্রনাথের মতো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্পী অথবা মানুষ ছিলেন না কবি বুদ্ধদেব বসু । কিন্তু তিনি রবীন্দ্রনাথের যোগ্য উত্তরসূরী ছিলেন বটে ! কর্মযোগী নন আপাত অর্থে । শিল্পকর্মকেই তিনি একমাত্র শ্রেষ্ঠ করণীয় কাজ ভাবতেন । যখন অনুবাদ করেছেন সমস্ত অন্তরাত্মা
ঢেলে দিয়েছেন সেখানেই । সম্ভবত এই একটা জায়গায় কিন্তু কবি বুদ্ধদেব বসু ছাড়িয়েও গেছেন রবীন্দ্রনাথ-কে ! আবার কবি জীবনানন্দ-কে তো অবশ্যই । জীবনানন্দের অনুদিত কোন কবিতাই আমার চোখে পড়েনি আজ পর্যন্ত । অথচ বোদলেয়র কিম্বা রিলকে !

BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW
BIDYUT-BHOWMICK-INTERVIEW

যাই হোক, কবিতা-চর্চা নিয়ে অনেক অনেক কথা ও লেখা হয় বা হচ্ছে, কিন্তু আমার বিচারে গত ১০ বছরের মধ্যে একটাও প্রকৃত কবিতা আমি দেখতে পাই-নি ! এটা আমার একেবারেই ব্যক্তিগত মতামত বলতে পারেন । প্রথম শ্রেণীর বেশিরভাগ ভালো পত্রিকায় লেখা প্রকাশ হলেই-যে ভালো কবিতার জন্ম হয়েছে , এটা আমার কাছে সত্যি হাস্যকর ! একটা কথা এখানে বলা যায় আমার অনেক কবিতা-কে আমি নিজেও ক-বি-তা বলে মনে করি না ! আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি , প্রত্যেক কবিদের একটা উদার ডিসিপ্লিন থাকা ভীষণ জরুরি ! ডিসিপ্লিন-এর অভাবেই
বোধকরি কবিদের কলম দিয়ে ভালো লেখা প্রকাশ পাচ্ছে না ! এটা ভীষণ দুঃখের কথা , তাই না ? যাঁরা সৃষ্টি করেন, তাঁরা এই পৃথিবীতে ঈশ্বরের ও আল্লার সমতুল্য বলা যায় । তারাই যখন কোনো লোভের বশবর্তী হয়ে ঘৃণ্য কাজ করে বসেন , তখন সেই কবিদের প্রতি সকলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা চলে যায় ! এইজন্য সকলকেই সাচ্চা ও পবিত্র থাকতে হবে , তা-না হলে কবিতার জন্ম বৃথা হবে ।

BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW

এই সময়ের সবচেয়ে স্বনিয়ন্ত্রিত লেখক ও কবি হয়ে উঠতে আমি অহর্নিশ আদ্যোপান্ত চেষ্টাটুকু করে যাচ্ছি । আমার চোখে কতযে ধান্দাবাজ লোকজন ঘুরছে-ফিরছে , আমার এই-যে ইদানিংকালে এতো নাম-ডাক সেটাকে মাটিতে মিশিয়ে দেবার জন্য ওরা সর্বত্র প্রস্তুত হয়ে আছে; এ ব্যাপারে আমি সব-সময় সতর্ক থাকি, যাতে এতো-দিনের সাধনা বিফলে না যায় ! আবার ভালো মানুষজন-ও আছেন , তাঁরা আমাকে সবসময়ই প্রেরণা দিয়ে চলেছেন ! তাই দু’ই দিকটাই আমাকে রক্ষা করতে হয় ! সুনাম রক্ষা করাটাও একটা বিশেষ যোগ্যতা, তাইনা ? আসলে নিজেকে সবসময়ই
পবিত্র করে রাখতে হয় ! আসল কথাটা হ’চ্ছে , আমি কোনো কিছুর জটিল বন্ধনে বাঁধা পড়তে রাজি নই, এতে নিজের সৃষ্টির কাজে ক্ষতি হয় । নানা তালে ঘুরতে আমি কিন্তু রাজি নই । এটা বলতেই হয় , আমার লক্ষ্য একটাই আমি যা কিছু লিখি , সেগুলো পাঠকদের কাছে ঠিকঠাক পৌঁছে দেওয়া । তাই এক জায়গায় আটকা পড়ে থাকা আমার স্বভাবে নেই । থাকলে হয়তো এই-যে বিদ্যুৎ ভৌমিক আপনাদের কবি হয়ে উঠতো না ।আমি আমাকে সঙ্গে নিয়ে চলি । কবিতার সাথে সারারাত জাগি ।কখনো ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি আত্মতত্ত্বে নিজের মধ্যে মনের মানুষকে এই ভাবে খোঁজার পথ ও আশ্রয় । মাঝেমধ্যে অনেক কথা মনে পড়ে , কত প্রিয় কবির মুখ চোখের সামনে ভেসে ওঠে! শক্তি দা, সুনীল দা, যাঁরা আমার কবিতাকে নিয়ে অনেক কথা সময়-অসময়ে বলেছেন , আমাকে অকৃপণ ভালোবাসা দিয়েছেন , তাঁদের কথা
বলতে গেলে অনেক কিছু বলতে হয় ! অনেক সময় আমার এই কবিতার দর্শন পজিটিভ হলেও পাঠকের দর্শনে গলদ অনেকটাই অনেক সময় থেকে যায় । ফলে কবি ও পাঠকের মধ্যে মননের বিনিময়ের অদেখা শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে । অনেক সময় পাঠকরা আমাকে সামনে পেয়ে সরাসরি অকপটে আমার কবিতা সম্পর্কে বলেন , যা তাঁদের কাছে কোনোভাবে পরিষ্কার নয় ।

BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW

BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW
Bidyut-Bhowmick

আমি মনে করি , কবিতার সমগ্রতার এই মহাবিষয়ের অন্দরমহলে প্রবেশ করতে গেলে কবিতার বিষয়ে অন্তর্গত হতে হয় এবং কবিতা- প্রাণ হতে হয় । আরও পরিষ্কার করে বলছি , কবির কবিতা নিয়ে এবং রচনার প্রস্তুতিপর্বের সময়কাল আবেগ প্রেম ব্যথা এবং যন্ত্রণা তার সাথে ইন্টারফিলোজফি অর্থাৎ অন্তর দর্শনটুকু ধরতে পারা বিশেষভাবে দরকার । এই বিশেষ জ্ঞানটুকু যাঁদের আছে তাঁরাই কবিতার একমাত্র প্রকৃত পাঠক , এটা আমি মনে ও প্রাণে বিশ্বাস করি । কবিতা অনুধাবন করতে গেলে কবিতার সাথে আদ্যোপান্ত অন্তরঙ্গ হতে হবে । এমন অনেক পাঠক-কে আমি চিনি , যাঁরা কোনোদিন এক কলম-ও লেখেন-নি , তাঁদের কবিতা
সম্পর্ক এতটা জ্ঞান-ধ্যান এবং ধারণা আমাকে ভীষণ অবাক করে । এতটাই তাঁদের অনুধাবন করার অমোঘ শক্তি যা দেখে ওদের এই তুলনাহীন যোগ্যতার প্রতি আমার কবিতা-কে সঁপে দেই এবং নির্ভর করি , এদের কথা শুনে গর্ব ও হয় । এরা অত্যন্ত
মেধাবী এবং অতিযোগ্য বলা যেতে পারে কবিতা বোঝার ব্যাপারে ও কবিতা কে নিয়ে সঠিক মূল্যায়ন করতে সক্ষম বলে মনে করি তাঁদেরকে ।

নিজের সঙ্গে অহর্নিশ যুদ্ধ চলছে, কোথাও প্রত্যন্ত গভীরে আদিম ধর্মের ক্লেদ ও দেশ – বিভাজনের ঠান্ডা অথচ রাজনৈতিক দাঙ্গা ।” উক্তিটি আমারই । আমার লেখক কিম্বা কবি জীবন ঐতিহাসিক কোনো ঘটনা নয় ; যা শুনে পাঠক সমাজ – এর কাছে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সংগ্রহ হয়ে দাঁড়াবে । কবিতা লিখছি, লিখে চলেছি নির্বিবাদে । একলা ঘরে অন্ধকারে — মনে মনে । অবিন্যস্ত ছড়ানো শব্দগুলোকে একটা সাদা পৃষ্ঠায় নীলকালিতে সাজিয়ে গুছিয়ে লিখি । বড় বেয়াড়া ব্যস্ততা আমার, একটা কবিতা লেখার সময় নানান ঝঞ্ঝাট এসে সম্মুখে দাঁড়ায় ! যখন এই সব ভারসাম্যহীন ঝঞ্ঝাট দেখা দেয়,
তখন কাগজ – কলম গুছিয়ে ভালো কিছু লেখা পড়ি । আমার কথা এখন অনেকেই জেনে গেছেন, টিভি চ্যানেলের এবং পত্র পত্রিকার দৌলতে । অনেক জায়গায় আমি সংবাদ শিরোনাম !

এই কবিতার জন্য অনেকের কাছে আমি হিংসার কারণ । যানি না, আমি তো কোনো কবিকে হিংসে করিনা তবে তাঁরা কেনযে আমাকে হিংসে করে, — এটাই ভাবতে অবাক লাগে ! ভারত ও বাংলাদেশের পাঠকবন্ধুদের ভালোবাসা প্রতিদিনই পাচ্ছি । প্রচুর চিঠি, ফোন, এস. এম. এস, — এসব তো চলতেই থাকে নিত্যদিন । আমাকে নিয়ে অনেক জায়গায় নানান খেঁজুড়ে গল্প – টল্প ইদানিং হয় বা হচ্ছে । সেসব কানেও আসছে । আমি আমার কবিতার ব্যাপারে একনিষ্ঠ, তাই কোনো কমপ্রোমাইস্ করিনা ! নিজের নামটাকে বহন করা অত সহজ সাধ্য ব্যাপার নয় । বন্ধু মহলটা আমার ভালোই । তাঁরা নানা ভাবে আমাকে উৎসাহ দেন । আমার কবিতার চাহিদা বরাবরই ভালো । আমার কাব্যগ্রন্থ ১ /কথা না রাখার কথা ২ /গাছ বৃষ্টি চোখের পাতা ভিজিয়ে ছিলো ৩ /নির্বাচিত কবিতা — র বাজারে বেশ কাটতি আছে । আমি মনে করি কেউ যদি তাঁর সৃষ্টির ভেতর নিজেকে ১০০ % দিয়ে দিতে পারেন, তাহলে তাঁর সাফল্য হবেই । কেন কবিতা প্রকাশিত হচ্ছে না, কিম্বা কোনো প্রকাশক তাঁকে পাত্তা দিচ্ছেন না, এসব দুঃশ্চিন্তা তাহলে আর হবে না । এইসব আমি কোনোদিন চিন্তায় আনিনি । লেখাটা মন – প্রাণ দিয়ে লিখি যাই । ফলের পেছনে দৌড়াইনি কোনোদিন । একটা কবিতা সৃষ্টি হবার আগে যত যন্ত্রণা, লেখা হয়ে যাবার পর অভ্যন্তরে প্লাবিত আনন্দ ! অনেকটা একটা শিশু জন্মের আগে এবং পরে যা ঘটনা ঘটে আমাদের মায়েদের । আমি একটা ঐতিহাসিক শহর হুগলি জেলার শ্রীরামপুরে থাকি । অর্থাৎ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ।

এখানে আমার অনেক কবি বন্ধুরা থাকেন, যাঁরা অহর্নিশ আদ্যোপান্ত ভাবে আমাকে কবি হয়ে ওঠার দুঃসাহস দিয়ে আসছেন দীর্ঘ ত্রিশবছর ধরে । এই পশ্চিমবঙ্গ এবং সুদূর বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর বেশির ভাগ পত্র পত্রিকা, বহু কাব্য সংকলন, এবং অগুন্তি কবিতা নির্ভর লিটল ম্যাগাজিনে দীর্ঘদিন ধরে লিখে চলেছি কবিতা, শুধু মাত্র কবিতা । আমি হাজার জায়গায় খাবলাই না । আমার প্রিয় কবির মধ্যে প্রথমেই রবীন্দ্রনাথ । তবে আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সকলেরই প্রিয় । জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে, বিনয় মজুমদার, — আমাকে ভীষণ ভাবে টানে । আপনারা সবাই জানেন, সুনীল দা অর্থাৎ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমাকে কবিতার জগতে একটা ব্রেক দিয়েছেন । খুব স্নেহ করতেন আমাকে তিনি । এখনকার কবিদের মধ্যে অনেকেই আছেন যাঁরা আমাকে অনুপ্রাণিত করেন । তাঁরা হলেন, — জয় গোস্বামী, সুবোধ সরকার, মৃদুল দাশগুপ্ত, অজিত বাইরী, শ্রীজাত *** এদের কবিতা ভীষণ ভাবে ভালো লাগে । সবশেষে বলি, — বাংলাদেশের পাঠকবন্ধুরা যাঁরা আমাকে কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক হিসাবে চিহ্নিত করেছেন তাঁদের প্রতি রইল আমার অতল মনের কবিতাময় শুভ কামনা ও এক সমুদ্র ভালোবাসা !

BIDYUT BHOWMICK

Facebook Comments