সাক্ষাৎকার

কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক এর সাক্ষাৎকার

মে ২, ২০২০
BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW

BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW

সত্যি বলতে কি , আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি কোনো কিছু লিখতে যখন বসি সেই মূহুর্তে আমি-কিন্তু পরিকল্পিত ভাবে চিন্তা ভাবনা করে সেই লেখা লিখি-না । লেখাটা আল্লার বলুন কিম্বা ঈশ্বরের আশীর্বাদে হয়ে যায় , এটুকুই বলতে পারি । এটা আমার
বহু বছর ধরে চলে আসছে । মোহহীনতাই একজন কবি ও লেখককে সঠিক সন্মানের রাস্তা দেখায় , তাই না ? আমি আমার কাব্যজীবনের চল্লিশটা বসন্ত দেখলাম , আত্মস্থ চেতনার তাগিদ ছাড়া আমার কাছে সময়ের অন্য কোনো প্রেরণার মূল্য নেই বলা যায় । বাংলার পাঠক কবিতার সাথে-সাথে আমাকে প্রকৃত-অর্থে চিনে ফেলেছেন । আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি— মহৎকবির লক্ষণই হল নিজের কবিতায় আত্মস্থভাবের আবিষ্কার করা, এবং তাতেই পূর্ণ অভিনিবিষ্ট হওয়া । এই প্রেরণা-ই আমাকে দিয়ে শুধু কবিতা লিখিয়ে নিয়ে চলেছে ! তাই কোনো লোভের দিকে এই চোখচুপ সরলতায় তাকাবার প্রয়োজন বা ইচ্ছা কখনোই কবি
বিদ্যুৎ ভৌমিকের হয়-নি এবং হবে-না , এটা জোর গলায় বলতে পারি । আরও পরিষ্কার করে যদি বলি , কোনো কাগজের চাহিদা মেটাতে বা যুগের আবহাওয়ায় নিজেকে বহতাময় স্রোতে ভেসে যেতে দিতে পারি না । অর্থ সাধনায় ব্রতী হই-নি ও হব-না ।আমি আমাকে একেবারে নিঃসঙ্গ রেখে ধীরে ধীরে এগিয়েছি ,কোনো চোটুল প্রলোভনে কখনো আমার ধ্রুব বিশ্বাস থেকে এক বিন্দু-ও সরে আসি-নি , খ্যাতির জন্য কোনো কৌশলী প্রচেষ্টা কোনোমতে চালাই-নি । তাই তো কবিতাপ্রাণ পাঠকসমাজের মুখে মুখে সেই যে আমার সেই বিখ্যাত কবিতার অমোঘ পংক্তি শুনতে পাই যে পৃথিবী ভেজার কথা/ সে পৃথিবী ভেজেনি”! এই ধ্বংসের মারমুখী সময়ে কবিতার কতটা প্রয়োজন আছে ? এটা আমিও অনেকবার আমাকে প্রশ্ন করেছি ।

ডারউইনের বিবর্তনবাদে বাঁদর থেকে মানুষে রূপান্তর হলেও এই মানুষের মনোবৃত্তি ,হিংসা-দ্বেষ-পরশ্রীকাতরতা যে সহজে যাওয়া-র নয়! পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এখনো সনাতন ধর্মের অভিশাপ, জাত-প্রথার আচরণ বিধি স্তম্ভিত করে রাখে । অথচ আমরাই উপগ্রহ নিক্ষেপণ করি বহিরাকাশে! এটা আমাদের লজ্জার ! এই জন্যেই কী এতো কবি- শিল্পী এবং সাহিত্যিকের জন্ম , কী করতে পারেছি আমারা ? এই পৃথিবীটাকে ভালোভাবে রাখতে পেরেছি, না আমারা ভালো আছি, বলুন ? এসব চিন্তা করেই আমার কাব্যগ্রন্থ কথা না রাখার কথা” লিখেছিলাম ! আমি কবিতা-কে সঙ্গে নিয়ে হাঁটি চলি, কথা বলি ! এ কথা আমি এর আগে আমার কবিতানির্ভর বহু সাক্ষাৎকার-এ বলেছি ।

BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW

কবিতাচর্চাতো সাহিত্য ও ভাষা চর্চার নামান্তর । আমাদের সৃষ্টির ও সংস্কৃতি মেধা মননের এবং কল্পনা ও উদ্ভাবনী শক্তির প্রয়োগ ঘটে সেখানে । কিন্তু অন্যদিকে এটা আবার দুঃখেরও সংবাদ ! দুঃখ এই কারণেই যে , যেভাবে লেখক সংখ্যা বাড়ছে সেভাবে কি পাঠকও তৈরি হচ্ছে ? আমি মনে করি , কবিতার নির্দিষ্ট কিছু
সংজ্ঞা নেই , ব্যক্তিগত ধারণাতেই কবিতা সঞ্জীবিত । কবিতা মানুষের জীবন ধারণের সামগ্রী না হলেও বেঁচে থাকার কিছুটা অবলম্বন-তো বটেই । এটা একটা বহমান প্রবাহ । বাংলা কবিতা নিয়ে যে পরীক্ষা নিরীক্ষণ চলছেই তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই বলেই চলে । তবু বেনোজলে আমাদের বোধ ভেসে
যাচ্ছে , অনেক লেখা পাতে এসে পড়েছে , কিন্তু অখাদ্যের কারণে মননে পৌঁছাচ্ছে-না ! যে হারে কবিতা ও কবির সংখ্যা দিন-দিন বাড়ছে , তাতে ভালো বা প্রকৃত কবিতা লেখা বাড়ছে-না ! সাহিত্যে আনন্দের ভোজে প্রকৃত মগ্ন পাঠককে অধিকাংশ সময়েই উপোস দিতে হচ্ছে ! আমি বিশ্বাস করি ; আমার সময়ের সঙ্গে কবি বিষ্ণু
দে ও বুদ্ধদেব বসুর কালের এই যে গুণগত পার্থক্য , এর জন্যই সম্ভাবত –
কবিতা – পত্রিকার সমান্তরাল ইদানিং আর কোনো পত্রিকা নেই বাংলা ভাষার । অবশ্য এর মধ্যে অনেক বৃদ্ধি ও প্রসার পেয়েছে কবি যশো প্রার্থীর সংখ্যা ! কিন্তু কবিতা তো কেবল কবিতা ছাপানোর কাগজ বা পত্রিকা ছিল না । কবিতা
ছিল সত্যিকারের কবিতার জন্য নিবেদিত পত্রিকা । রবীন্দ্রনাথের মতো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্পী অথবা মানুষ ছিলেন না কবি বুদ্ধদেব বসু । কিন্তু তিনি রবীন্দ্রনাথের যোগ্য উত্তরসূরী ছিলেন বটে ! কর্মযোগী নন আপাত অর্থে । শিল্পকর্মকেই তিনি একমাত্র শ্রেষ্ঠ করণীয় কাজ ভাবতেন । যখন অনুবাদ করেছেন সমস্ত অন্তরাত্মা
ঢেলে দিয়েছেন সেখানেই । সম্ভবত এই একটা জায়গায় কিন্তু কবি বুদ্ধদেব বসু ছাড়িয়েও গেছেন রবীন্দ্রনাথ-কে ! আবার কবি জীবনানন্দ-কে তো অবশ্যই । জীবনানন্দের অনুদিত কোন কবিতাই আমার চোখে পড়েনি আজ পর্যন্ত । অথচ বোদলেয়র কিম্বা রিলকে !

BIDYUT-BHOWMICK-INTERVIEW

যাই হোক, কবিতা-চর্চা নিয়ে অনেক অনেক কথা ও লেখা হয় বা হচ্ছে, কিন্তু আমার বিচারে গত ১০ বছরের মধ্যে একটাও প্রকৃত কবিতা আমি দেখতে পাই-নি ! এটা আমার একেবারেই ব্যক্তিগত মতামত বলতে পারেন । প্রথম শ্রেণীর বেশিরভাগ ভালো পত্রিকায় লেখা প্রকাশ হলেই-যে ভালো কবিতার জন্ম হয়েছে , এটা আমার কাছে সত্যি হাস্যকর ! একটা কথা এখানে বলা যায় আমার অনেক কবিতা-কে আমি নিজেও ক-বি-তা বলে মনে করি না ! আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি , প্রত্যেক কবিদের একটা উদার ডিসিপ্লিন থাকা ভীষণ জরুরি ! ডিসিপ্লিন-এর অভাবেই
বোধকরি কবিদের কলম দিয়ে ভালো লেখা প্রকাশ পাচ্ছে না ! এটা ভীষণ দুঃখের কথা , তাই না ? যাঁরা সৃষ্টি করেন, তাঁরা এই পৃথিবীতে ঈশ্বরের ও আল্লার সমতুল্য বলা যায় । তারাই যখন কোনো লোভের বশবর্তী হয়ে ঘৃণ্য কাজ করে বসেন , তখন সেই কবিদের প্রতি সকলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা চলে যায় ! এইজন্য সকলকেই সাচ্চা ও পবিত্র থাকতে হবে , তা-না হলে কবিতার জন্ম বৃথা হবে ।

BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW

এই সময়ের সবচেয়ে স্বনিয়ন্ত্রিত লেখক ও কবি হয়ে উঠতে আমি অহর্নিশ আদ্যোপান্ত চেষ্টাটুকু করে যাচ্ছি । আমার চোখে কতযে ধান্দাবাজ লোকজন ঘুরছে-ফিরছে , আমার এই-যে ইদানিংকালে এতো নাম-ডাক সেটাকে মাটিতে মিশিয়ে দেবার জন্য ওরা সর্বত্র প্রস্তুত হয়ে আছে; এ ব্যাপারে আমি সব-সময় সতর্ক থাকি, যাতে এতো-দিনের সাধনা বিফলে না যায় ! আবার ভালো মানুষজন-ও আছেন , তাঁরা আমাকে সবসময়ই প্রেরণা দিয়ে চলেছেন ! তাই দু’ই দিকটাই আমাকে রক্ষা করতে হয় ! সুনাম রক্ষা করাটাও একটা বিশেষ যোগ্যতা, তাইনা ? আসলে নিজেকে সবসময়ই
পবিত্র করে রাখতে হয় ! আসল কথাটা হ’চ্ছে , আমি কোনো কিছুর জটিল বন্ধনে বাঁধা পড়তে রাজি নই, এতে নিজের সৃষ্টির কাজে ক্ষতি হয় । নানা তালে ঘুরতে আমি কিন্তু রাজি নই । এটা বলতেই হয় , আমার লক্ষ্য একটাই আমি যা কিছু লিখি , সেগুলো পাঠকদের কাছে ঠিকঠাক পৌঁছে দেওয়া । তাই এক জায়গায় আটকা পড়ে থাকা আমার স্বভাবে নেই । থাকলে হয়তো এই-যে বিদ্যুৎ ভৌমিক আপনাদের কবি হয়ে উঠতো না ।আমি আমাকে সঙ্গে নিয়ে চলি । কবিতার সাথে সারারাত জাগি ।কখনো ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি আত্মতত্ত্বে নিজের মধ্যে মনের মানুষকে এই ভাবে খোঁজার পথ ও আশ্রয় । মাঝেমধ্যে অনেক কথা মনে পড়ে , কত প্রিয় কবির মুখ চোখের সামনে ভেসে ওঠে! শক্তি দা, সুনীল দা, যাঁরা আমার কবিতাকে নিয়ে অনেক কথা সময়-অসময়ে বলেছেন , আমাকে অকৃপণ ভালোবাসা দিয়েছেন , তাঁদের কথা
বলতে গেলে অনেক কিছু বলতে হয় ! অনেক সময় আমার এই কবিতার দর্শন পজিটিভ হলেও পাঠকের দর্শনে গলদ অনেকটাই অনেক সময় থেকে যায় । ফলে কবি ও পাঠকের মধ্যে মননের বিনিময়ের অদেখা শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে । অনেক সময় পাঠকরা আমাকে সামনে পেয়ে সরাসরি অকপটে আমার কবিতা সম্পর্কে বলেন , যা তাঁদের কাছে কোনোভাবে পরিষ্কার নয় ।

BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW

আমি মনে করি , কবিতার সমগ্রতার এই মহাবিষয়ের অন্দরমহলে প্রবেশ করতে গেলে কবিতার বিষয়ে অন্তর্গত হতে হয় এবং কবিতা- প্রাণ হতে হয় । আরও পরিষ্কার করে বলছি , কবির কবিতা নিয়ে এবং রচনার প্রস্তুতিপর্বের সময়কাল আবেগ প্রেম ব্যথা এবং যন্ত্রণা তার সাথে ইন্টারফিলোজফি অর্থাৎ অন্তর দর্শনটুকু ধরতে পারা বিশেষভাবে দরকার । এই বিশেষ জ্ঞানটুকু যাঁদের আছে তাঁরাই কবিতার একমাত্র প্রকৃত পাঠক , এটা আমি মনে ও প্রাণে বিশ্বাস করি । কবিতা অনুধাবন করতে গেলে কবিতার সাথে আদ্যোপান্ত অন্তরঙ্গ হতে হবে । এমন অনেক পাঠক-কে আমি চিনি , যাঁরা কোনোদিন এক কলম-ও লেখেন-নি , তাঁদের কবিতা
সম্পর্ক এতটা জ্ঞান-ধ্যান এবং ধারণা আমাকে ভীষণ অবাক করে । এতটাই তাঁদের অনুধাবন করার অমোঘ শক্তি যা দেখে ওদের এই তুলনাহীন যোগ্যতার প্রতি আমার কবিতা-কে সঁপে দেই এবং নির্ভর করি , এদের কথা শুনে গর্ব ও হয় । এরা অত্যন্ত
মেধাবী এবং অতিযোগ্য বলা যেতে পারে কবিতা বোঝার ব্যাপারে ও কবিতা কে নিয়ে সঠিক মূল্যায়ন করতে সক্ষম বলে মনে করি তাঁদেরকে ।

তাই আমার কবিতাপ্রীতি তাঁদের ভারসাম্যহীন কঠিন ও কঠোর সমালোচনাও আমাকে সব সময়ে ইন্সপায়ার্ড করে আসছে । এই অবকাশে তাঁদের প্রতি আমার পাহাড় প্রতিম কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানাচ্ছি । যাই হোক , আমার এই রচনা অর্থাৎ কবিতানির্ভর এই বিশেষ নিবন্ধের মতামতের অপেক্ষায় থাকলাম । সবাই ভালো
থাকুন এবং সুন্দর থাকুন জয় কবিতার জয়।

BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW

You Might Also Like

No Comments

Please Let us know What you think!?

Translate »
%d bloggers like this: