কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক এর সাক্ষাৎকার

মে ২, ২০২০
BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW

BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW

সত্যি কথা বলতে কি, আমার কবিতা সম্পর্কে কিছু বলার বা নিজের কাব্যময় অনুভব নিয়ে বলতে বড়ই দ্বিধা জাগে । আসলে এই ব্যাপারটা অনেকটাই মায়াদর্পণ, অর্থাৎ ম্যাজিক রিয়ালিটি ” বলা যেতে পারে । এই দর্পণে উকি দিয়ে দেখলে কত অলীক কিছু আমরা খুঁজে পাই । অক্ষরে অক্ষরে কতযে জড়ানো বিলাপ । তাই কবিতার প্রতি আভূমি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতেই হয় । কবিতা আমার নিজের প্রাত্যহিকতাকে তছনছ করে, চুরমার করে । সহজভাবে চলতে – চলতে কবিতা মানুষকে বেসামাল করে দেয় । একটা ভাল কবিতা পড়লে মন অনাস্বাদিত আনন্দে ভরে যায় । আমি মনে করি, এই ভালো লাগার একটা অদৃশ্য চাপা উত্তেজনা ও অস্বস্তি থাকে । তবে কি, আমি আদ্যোপান্ত ভাবে মনে করি — আমারা এই অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতে চাই না । একটা ভালো কবিতার জন্ম হয় আসলে মেধা ও আবেগের মিলিত রসায়ন থেকেই । শুধু আবেগ কবিতার সংহতিকে নষ্ট করে । আর মেধা নির্ভর কবিতা হৃদয়কে স্পর্শ করেনা । চেনা, জানা – দৃশ্য যিনি মৃদু উত্তেজনায় ফুটিয়ে তোলেন তাঁর কবিতায় থাকে আলোর কারুকাজ । আমি খুব সতর্ক থাকি যখন কলম নিয়ে বসি কিছু একটা লেখার জন্য ।

কবিতার জন্ম হয় না, আবির্ভাব হয় বলতে পারি । কবি অনেকটাই নিভৃতচারী, মনন ও তাঁর জীবনধর্মী চেতনাকে নিরন্তর লালন ও পালন করে আসছেন যুগ যুগ ধরে । তার ফল সরূপ শব্দের কারুকার্যখচিত ভাব – ভাবনায় গড়া কবিতার প্রকাশ হয় । আবার বলছি কবিতার জন্ম হয় না । আমি ৭০ – এর দশকের কিছু পর থেকে কবিতা লিখছি । আমি বিশ্বাস করি না, সত্যকে স্বরচিত সুন্দরের খামের ভেতর পুরে রাখতে চাই না । তবে রাখা বা না রাখার ব্যাপারে বিশ্বাস ~ অবিশ্বাসের দোলাচল, ঐতিহ্য ও সংস্কারের মান ভঞ্জন, বিষয় না বিন্যাস — মেধা না কেবল মনন — হৃদয়ে হৃদয় খোঁড়া — প্রবাহ জোড়া কেবলই একলা হতে থাকা, নিঃস্ব । একটা বিশেষ সত্যি কথা হল, — আমি মদ না ছুঁয়েও মাতাল । আসলে কি, যে নেশা আমি ৩০ /৩৫ বছর ধরে প্রতিনিয়ত করে চলেছি তার মায়াময় অনুভূতি আমি ছাড়া অন্য কেউ অনুধাবন করতে পারবে না ।

BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW

BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW
Bidyut-bhowmik

সত্যি বলতে কি , আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি কোনো কিছু লিখতে যখন বসি সেই মূহুর্তে আমি-কিন্তু পরিকল্পিত ভাবে চিন্তা ভাবনা করে সেই লেখা লিখি-না । লেখাটা আল্লার বলুন কিম্বা ঈশ্বরের আশীর্বাদে হয়ে যায় , এটুকুই বলতে পারি । এটা আমার
বহু বছর ধরে চলে আসছে । মোহহীনতাই একজন কবি ও লেখককে সঠিক সন্মানের রাস্তা দেখায় , তাই না ? আমি আমার কাব্যজীবনের চল্লিশটা বসন্ত দেখলাম , আত্মস্থ চেতনার তাগিদ ছাড়া আমার কাছে সময়ের অন্য কোনো প্রেরণার মূল্য নেই বলা যায় । বাংলার পাঠক কবিতার সাথে-সাথে আমাকে প্রকৃত-অর্থে চিনে ফেলেছেন । আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি— মহৎকবির লক্ষণই হল নিজের কবিতায় আত্মস্থভাবের আবিষ্কার করা, এবং তাতেই পূর্ণ অভিনিবিষ্ট হওয়া । এই প্রেরণা-ই আমাকে দিয়ে শুধু কবিতা লিখিয়ে নিয়ে চলেছে ! তাই কোনো লোভের দিকে এই চোখচুপ সরলতায় তাকাবার প্রয়োজন বা ইচ্ছা কখনোই কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকের হয়-নি এবং হবে-না , এটা জোর গলায় বলতে পারি । আরও পরিষ্কার করে যদি বলি , কোনো কাগজের চাহিদা মেটাতে বা যুগের আবহাওয়ায় নিজেকে বহতাময় স্রোতে ভেসে যেতে দিতে পারি না । অর্থ সাধনায় ব্রতী হই-নি ও হব-না । আমি আমাকে একেবারে নিঃসঙ্গ রেখে ধীরে ধীরে এগিয়েছি ,কোনো চোটুল প্রলোভনে কখনো আমার ধ্রুব বিশ্বাস থেকে এক বিন্দু-ও সরে আসি-নি , খ্যাতির জন্য কোনো কৌশলী প্রচেষ্টা কোনোমতে চালাই-নি । তাই তো কবিতাপ্রাণ পাঠকসমাজের মুখে মুখে সেই যে আমার সেই বিখ্যাত কবিতার অমোঘ পংক্তি শুনতে পাই যে পৃথিবী ভেজার কথা / সে পৃথিবী ভেজেনি”! এই ধ্বংসের মারমুখী সময়ে কবিতার কতটা প্রয়োজন আছে ? এটা আমিও অনেকবার আমাকে প্রশ্ন করেছি ।

ডারউইনের বিবর্তনবাদে বাঁদর থেকে মানুষে রূপান্তর হলেও এই মানুষের মনোবৃত্তি ,হিংসা-দ্বেষ-পরশ্রীকাতরতা যে সহজে যাওয়া-র নয়! পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এখনো সনাতন ধর্মের অভিশাপ, জাত-প্রথার আচরণ বিধি স্তম্ভিত করে রাখে । অথচ আমরাই উপগ্রহ নিক্ষেপণ করি বহিরাকাশে! এটা আমাদের লজ্জার ! এই জন্যেই কী এতো কবি- শিল্পী এবং সাহিত্যিকের জন্ম , কী করতে পারেছি আমারা ? এই পৃথিবীটাকে ভালোভাবে রাখতে পেরেছি, না আমারা ভালো আছি, বলুন ? এসব চিন্তা করেই আমার কাব্যগ্রন্থ কথা না রাখার কথা” লিখেছিলাম ! আমি কবিতা-কে সঙ্গে নিয়ে হাঁটি চলি, কথা বলি ! এ কথা আমি এর আগে আমার কবিতানির্ভর বহু সাক্ষাৎকার-এ বলেছি ।

BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW

কবিতাচর্চাতো সাহিত্য ও ভাষা চর্চার নামান্তর । আমাদের সৃষ্টির ও সংস্কৃতি মেধা মননের এবং কল্পনা ও উদ্ভাবনী শক্তির প্রয়োগ ঘটে সেখানে । কিন্তু অন্যদিকে এটা আবার দুঃখেরও সংবাদ ! দুঃখ এই কারণেই যে , যেভাবে লেখক সংখ্যা বাড়ছে সেভাবে কি পাঠকও তৈরি হচ্ছে ? আমি মনে করি , কবিতার নির্দিষ্ট কিছু
সংজ্ঞা নেই , ব্যক্তিগত ধারণাতেই কবিতা সঞ্জীবিত । কবিতা মানুষের জীবন ধারণের সামগ্রী না হলেও বেঁচে থাকার কিছুটা অবলম্বন-তো বটেই । এটা একটা বহমান প্রবাহ । বাংলা কবিতা নিয়ে যে পরীক্ষা নিরীক্ষণ চলছেই তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই বলেই চলে । তবু বেনোজলে আমাদের বোধ ভেসে
যাচ্ছে , অনেক লেখা পাতে এসে পড়েছে , কিন্তু অখাদ্যের কারণে মননে পৌঁছাচ্ছে-না ! যে হারে কবিতা ও কবির সংখ্যা দিন-দিন বাড়ছে , তাতে ভালো বা প্রকৃত কবিতা লেখা বাড়ছে-না ! সাহিত্যে আনন্দের ভোজে প্রকৃত মগ্ন পাঠককে অধিকাংশ সময়েই উপোস দিতে হচ্ছে ! আমি বিশ্বাস করি ; আমার সময়ের সঙ্গে কবি বিষ্ণু
দে ও বুদ্ধদেব বসুর কালের এই যে গুণগত পার্থক্য , এর জন্যই সম্ভাবত –
কবিতা – পত্রিকার সমান্তরাল ইদানিং আর কোনো পত্রিকা নেই বাংলা ভাষার । অবশ্য এর মধ্যে অনেক বৃদ্ধি ও প্রসার পেয়েছে কবি যশো প্রার্থীর সংখ্যা ! কিন্তু কবিতা তো কেবল কবিতা ছাপানোর কাগজ বা পত্রিকা ছিল না । কবিতা
ছিল সত্যিকারের কবিতার জন্য নিবেদিত পত্রিকা । রবীন্দ্রনাথের মতো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্পী অথবা মানুষ ছিলেন না কবি বুদ্ধদেব বসু । কিন্তু তিনি রবীন্দ্রনাথের যোগ্য উত্তরসূরী ছিলেন বটে ! কর্মযোগী নন আপাত অর্থে । শিল্পকর্মকেই তিনি একমাত্র শ্রেষ্ঠ করণীয় কাজ ভাবতেন । যখন অনুবাদ করেছেন সমস্ত অন্তরাত্মা
ঢেলে দিয়েছেন সেখানেই । সম্ভবত এই একটা জায়গায় কিন্তু কবি বুদ্ধদেব বসু ছাড়িয়েও গেছেন রবীন্দ্রনাথ-কে ! আবার কবি জীবনানন্দ-কে তো অবশ্যই । জীবনানন্দের অনুদিত কোন কবিতাই আমার চোখে পড়েনি আজ পর্যন্ত । অথচ বোদলেয়র কিম্বা রিলকে !

BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW
BIDYUT-BHOWMICK-INTERVIEW

যাই হোক, কবিতা-চর্চা নিয়ে অনেক অনেক কথা ও লেখা হয় বা হচ্ছে, কিন্তু আমার বিচারে গত ১০ বছরের মধ্যে একটাও প্রকৃত কবিতা আমি দেখতে পাই-নি ! এটা আমার একেবারেই ব্যক্তিগত মতামত বলতে পারেন । প্রথম শ্রেণীর বেশিরভাগ ভালো পত্রিকায় লেখা প্রকাশ হলেই-যে ভালো কবিতার জন্ম হয়েছে , এটা আমার কাছে সত্যি হাস্যকর ! একটা কথা এখানে বলা যায় আমার অনেক কবিতা-কে আমি নিজেও ক-বি-তা বলে মনে করি না ! আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি , প্রত্যেক কবিদের একটা উদার ডিসিপ্লিন থাকা ভীষণ জরুরি ! ডিসিপ্লিন-এর অভাবেই
বোধকরি কবিদের কলম দিয়ে ভালো লেখা প্রকাশ পাচ্ছে না ! এটা ভীষণ দুঃখের কথা , তাই না ? যাঁরা সৃষ্টি করেন, তাঁরা এই পৃথিবীতে ঈশ্বরের ও আল্লার সমতুল্য বলা যায় । তারাই যখন কোনো লোভের বশবর্তী হয়ে ঘৃণ্য কাজ করে বসেন , তখন সেই কবিদের প্রতি সকলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা চলে যায় ! এইজন্য সকলকেই সাচ্চা ও পবিত্র থাকতে হবে , তা-না হলে কবিতার জন্ম বৃথা হবে ।

BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW

এই সময়ের সবচেয়ে স্বনিয়ন্ত্রিত লেখক ও কবি হয়ে উঠতে আমি অহর্নিশ আদ্যোপান্ত চেষ্টাটুকু করে যাচ্ছি । আমার চোখে কতযে ধান্দাবাজ লোকজন ঘুরছে-ফিরছে , আমার এই-যে ইদানিংকালে এতো নাম-ডাক সেটাকে মাটিতে মিশিয়ে দেবার জন্য ওরা সর্বত্র প্রস্তুত হয়ে আছে; এ ব্যাপারে আমি সব-সময় সতর্ক থাকি, যাতে এতো-দিনের সাধনা বিফলে না যায় ! আবার ভালো মানুষজন-ও আছেন , তাঁরা আমাকে সবসময়ই প্রেরণা দিয়ে চলেছেন ! তাই দু’ই দিকটাই আমাকে রক্ষা করতে হয় ! সুনাম রক্ষা করাটাও একটা বিশেষ যোগ্যতা, তাইনা ? আসলে নিজেকে সবসময়ই
পবিত্র করে রাখতে হয় ! আসল কথাটা হ’চ্ছে , আমি কোনো কিছুর জটিল বন্ধনে বাঁধা পড়তে রাজি নই, এতে নিজের সৃষ্টির কাজে ক্ষতি হয় । নানা তালে ঘুরতে আমি কিন্তু রাজি নই । এটা বলতেই হয় , আমার লক্ষ্য একটাই আমি যা কিছু লিখি , সেগুলো পাঠকদের কাছে ঠিকঠাক পৌঁছে দেওয়া । তাই এক জায়গায় আটকা পড়ে থাকা আমার স্বভাবে নেই । থাকলে হয়তো এই-যে বিদ্যুৎ ভৌমিক আপনাদের কবি হয়ে উঠতো না ।আমি আমাকে সঙ্গে নিয়ে চলি । কবিতার সাথে সারারাত জাগি ।কখনো ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি আত্মতত্ত্বে নিজের মধ্যে মনের মানুষকে এই ভাবে খোঁজার পথ ও আশ্রয় । মাঝেমধ্যে অনেক কথা মনে পড়ে , কত প্রিয় কবির মুখ চোখের সামনে ভেসে ওঠে! শক্তি দা, সুনীল দা, যাঁরা আমার কবিতাকে নিয়ে অনেক কথা সময়-অসময়ে বলেছেন , আমাকে অকৃপণ ভালোবাসা দিয়েছেন , তাঁদের কথা
বলতে গেলে অনেক কিছু বলতে হয় ! অনেক সময় আমার এই কবিতার দর্শন পজিটিভ হলেও পাঠকের দর্শনে গলদ অনেকটাই অনেক সময় থেকে যায় । ফলে কবি ও পাঠকের মধ্যে মননের বিনিময়ের অদেখা শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে । অনেক সময় পাঠকরা আমাকে সামনে পেয়ে সরাসরি অকপটে আমার কবিতা সম্পর্কে বলেন , যা তাঁদের কাছে কোনোভাবে পরিষ্কার নয় ।

BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW

BIDYUT BHOWMICK INTERVIEW
Bidyut-Bhowmick

আমি মনে করি , কবিতার সমগ্রতার এই মহাবিষয়ের অন্দরমহলে প্রবেশ করতে গেলে কবিতার বিষয়ে অন্তর্গত হতে হয় এবং কবিতা- প্রাণ হতে হয় । আরও পরিষ্কার করে বলছি , কবির কবিতা নিয়ে এবং রচনার প্রস্তুতিপর্বের সময়কাল আবেগ প্রেম ব্যথা এবং যন্ত্রণা তার সাথে ইন্টারফিলোজফি অর্থাৎ অন্তর দর্শনটুকু ধরতে পারা বিশেষভাবে দরকার । এই বিশেষ জ্ঞানটুকু যাঁদের আছে তাঁরাই কবিতার একমাত্র প্রকৃত পাঠক , এটা আমি মনে ও প্রাণে বিশ্বাস করি । কবিতা অনুধাবন করতে গেলে কবিতার সাথে আদ্যোপান্ত অন্তরঙ্গ হতে হবে । এমন অনেক পাঠক-কে আমি চিনি , যাঁরা কোনোদিন এক কলম-ও লেখেন-নি , তাঁদের কবিতা
সম্পর্ক এতটা জ্ঞান-ধ্যান এবং ধারণা আমাকে ভীষণ অবাক করে । এতটাই তাঁদের অনুধাবন করার অমোঘ শক্তি যা দেখে ওদের এই তুলনাহীন যোগ্যতার প্রতি আমার কবিতা-কে সঁপে দেই এবং নির্ভর করি , এদের কথা শুনে গর্ব ও হয় । এরা অত্যন্ত
মেধাবী এবং অতিযোগ্য বলা যেতে পারে কবিতা বোঝার ব্যাপারে ও কবিতা কে নিয়ে সঠিক মূল্যায়ন করতে সক্ষম বলে মনে করি তাঁদেরকে ।

নিজের সঙ্গে অহর্নিশ যুদ্ধ চলছে, কোথাও প্রত্যন্ত গভীরে আদিম ধর্মের ক্লেদ ও দেশ – বিভাজনের ঠান্ডা অথচ রাজনৈতিক দাঙ্গা ।” উক্তিটি আমারই । আমার লেখক কিম্বা কবি জীবন ঐতিহাসিক কোনো ঘটনা নয় ; যা শুনে পাঠক সমাজ – এর কাছে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সংগ্রহ হয়ে দাঁড়াবে । কবিতা লিখছি, লিখে চলেছি নির্বিবাদে । একলা ঘরে অন্ধকারে — মনে মনে । অবিন্যস্ত ছড়ানো শব্দগুলোকে একটা সাদা পৃষ্ঠায় নীলকালিতে সাজিয়ে গুছিয়ে লিখি । বড় বেয়াড়া ব্যস্ততা আমার, একটা কবিতা লেখার সময় নানান ঝঞ্ঝাট এসে সম্মুখে দাঁড়ায় ! যখন এই সব ভারসাম্যহীন ঝঞ্ঝাট দেখা দেয়,
তখন কাগজ – কলম গুছিয়ে ভালো কিছু লেখা পড়ি । আমার কথা এখন অনেকেই জেনে গেছেন, টিভি চ্যানেলের এবং পত্র পত্রিকার দৌলতে । অনেক জায়গায় আমি সংবাদ শিরোনাম !

এই কবিতার জন্য অনেকের কাছে আমি হিংসার কারণ । যানি না, আমি তো কোনো কবিকে হিংসে করিনা তবে তাঁরা কেনযে আমাকে হিংসে করে, — এটাই ভাবতে অবাক লাগে ! ভারত ও বাংলাদেশের পাঠকবন্ধুদের ভালোবাসা প্রতিদিনই পাচ্ছি । প্রচুর চিঠি, ফোন, এস. এম. এস, — এসব তো চলতেই থাকে নিত্যদিন । আমাকে নিয়ে অনেক জায়গায় নানান খেঁজুড়ে গল্প – টল্প ইদানিং হয় বা হচ্ছে । সেসব কানেও আসছে । আমি আমার কবিতার ব্যাপারে একনিষ্ঠ, তাই কোনো কমপ্রোমাইস্ করিনা ! নিজের নামটাকে বহন করা অত সহজ সাধ্য ব্যাপার নয় । বন্ধু মহলটা আমার ভালোই । তাঁরা নানা ভাবে আমাকে উৎসাহ দেন । আমার কবিতার চাহিদা বরাবরই ভালো । আমার কাব্যগ্রন্থ ১ /কথা না রাখার কথা ২ /গাছ বৃষ্টি চোখের পাতা ভিজিয়ে ছিলো ৩ /নির্বাচিত কবিতা — র বাজারে বেশ কাটতি আছে । আমি মনে করি কেউ যদি তাঁর সৃষ্টির ভেতর নিজেকে ১০০ % দিয়ে দিতে পারেন, তাহলে তাঁর সাফল্য হবেই । কেন কবিতা প্রকাশিত হচ্ছে না, কিম্বা কোনো প্রকাশক তাঁকে পাত্তা দিচ্ছেন না, এসব দুঃশ্চিন্তা তাহলে আর হবে না । এইসব আমি কোনোদিন চিন্তায় আনিনি । লেখাটা মন – প্রাণ দিয়ে লিখি যাই । ফলের পেছনে দৌড়াইনি কোনোদিন । একটা কবিতা সৃষ্টি হবার আগে যত যন্ত্রণা, লেখা হয়ে যাবার পর অভ্যন্তরে প্লাবিত আনন্দ ! অনেকটা একটা শিশু জন্মের আগে এবং পরে যা ঘটনা ঘটে আমাদের মায়েদের । আমি একটা ঐতিহাসিক শহর হুগলি জেলার শ্রীরামপুরে থাকি । অর্থাৎ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ।

এখানে আমার অনেক কবি বন্ধুরা থাকেন, যাঁরা অহর্নিশ আদ্যোপান্ত ভাবে আমাকে কবি হয়ে ওঠার দুঃসাহস দিয়ে আসছেন দীর্ঘ ত্রিশবছর ধরে । এই পশ্চিমবঙ্গ এবং সুদূর বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর বেশির ভাগ পত্র পত্রিকা, বহু কাব্য সংকলন, এবং অগুন্তি কবিতা নির্ভর লিটল ম্যাগাজিনে দীর্ঘদিন ধরে লিখে চলেছি কবিতা, শুধু মাত্র কবিতা । আমি হাজার জায়গায় খাবলাই না । আমার প্রিয় কবির মধ্যে প্রথমেই রবীন্দ্রনাথ । তবে আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সকলেরই প্রিয় । জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে, বিনয় মজুমদার, — আমাকে ভীষণ ভাবে টানে । আপনারা সবাই জানেন, সুনীল দা অর্থাৎ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমাকে কবিতার জগতে একটা ব্রেক দিয়েছেন । খুব স্নেহ করতেন আমাকে তিনি । এখনকার কবিদের মধ্যে অনেকেই আছেন যাঁরা আমাকে অনুপ্রাণিত করেন । তাঁরা হলেন, — জয় গোস্বামী, সুবোধ সরকার, মৃদুল দাশগুপ্ত, অজিত বাইরী, শ্রীজাত *** এদের কবিতা ভীষণ ভাবে ভালো লাগে । সবশেষে বলি, — বাংলাদেশের পাঠকবন্ধুরা যাঁরা আমাকে কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক হিসাবে চিহ্নিত করেছেন তাঁদের প্রতি রইল আমার অতল মনের কবিতাময় শুভ কামনা ও এক সমুদ্র ভালোবাসা !

BIDYUT BHOWMICK

You Might Also Like

No Comments

Please Let us know What you think!?

%d bloggers like this: