কবিতায় জাগরণ (অক্টো-ডিসে) ২০১৯

অক্টোবর ১, ২০১৯
Bangla little magazine

Bangla little magazine kobitay jagoron (Oct-Dec) 2019

বাংলা লিটল ম্যাগাজিন কবিতায় জাগরণ (অক্টো-ডিসেম্বার)২০১৯ সংখ্যা নিয়ে সম্পাদকের কিছু কথাঃ

Shahida-Rahman-Munney

সময় ছুটে চলেছে আপন গতিতে,সেই সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আমরাও ছুটতে চেষ্টা করছি সমতালে, এই ছুটে চলায় কখনো কখনো গরমিল হয়ে যায় পথের পিচ্ছিলতায় চলার গতি! তবুও এগুতে হবে এবং পাল্লা দিতে হবে বহতা নদীর মতো বয়ে যাওয়া সময়ের সাথে, এই পথ পরিক্রমায় যারা লেখা দিয়ে, সহযোগিতা করেছেন তাঁদের সকলের কাছে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা,

Bangla little magazine

আপনাদের পাশে থাকার ভরসায় উজ্জ্বীবিত হই শত কষ্টে,শত সীমাবদ্ধতায়,এভাবেই সবসময় সাথে থাকুন পাশে রাখুন! বর্তমানে দেশ ও জাতি খুব অস্থির একটা সময় অতিবাহিত করছে ডেঙ্গু আতঙ্কে , সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কেটে যাবে এই ঘোর তমশা পৃথিবীর অসহায়, নির্যাতিত মুসলিম জাতির উপর বর্ষিত হোক শান্তির অমিয় ধারা এটাই কাম্য! কবিতায় জাগরণ পরিবারের পক্ষ থেকে আবারো কৃতজ্ঞতা সকলের প্রতি যারা এক বিন্দু হলেও আন্তরিকতা দেখিয়েছেন!, পথে নেমেছি হাঁটার জন্য,পথ যতোই কঠিন হোক আমি হেঁটে যাবো এ আমার দৃঢ় প্রত্যয়!

“উম্মুক্ত হোক ছন্দের সীমানা”
“কথা দিবেন কথা রাখার জন্য ভাঙার জন্য নয়”!
জয় হোক মানবতার,জয় হোক কবিতার!!”

সম্পদক সাহিদা রহমান মুন্নী!

Bangla little magazine

download button free kobitay jagoron

যাদের লেখায় অলংকিত এই সংখ্যাঃ

১.কাজী আনিসুল হক
২.মোঃ বদিউল আলম বাচ্ছু
৩.এস এম জুনেদ জামান
৪.দালান জাহান
৫.অভিলাষ মাহমুদ
৬.মাসুদা ইতি
৭.মুস্তাফিজুর রহমান
৮.শান্তা মরিয়ম
৯.জেইনাল আবেদীন চৌধুরী (সৌদি আরব)
১০.আব্দুল বাসেত
১১.রিলু রিয়াজ
১২.শক্তিপ্রসাদ ঘোষ(ভারত)
১৩.আসলাম প্রধান
১৪.সাকিব জামান
১৫.গোলাম রব্বানী টুপুল
১৬.অর্ণব আশিক
১৭.মাহবুব আহমেদ
১৮.মোবাশ্বীর হোসাইন
১৯. ওয়াহিদ আল হাসান
২০.সবুজ সরকার (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)
২১.সাহিদা রহমান মুন্নী
২২.বিশ্বাস মিলি (গল্প)

book baner shahida rahman munney

কষ্ট ভোলার মন্ত্র
কাজী আনিসুল হক

Kazi-Anisul-haque

এই মেয়ে তুমি বাসবে ভালো?
হঠাৎ করে পোড়া বুকে ছুঁয়েছে আলো।
আঁধারঘন জীবনপটে জোনাক হাসে
নতুন চাঁদ করে খেলা বাঁকা ঠোটে।
ভাবনা ভুলে স্বপ্ন আঁকি নীলাকাশে
বোঁচা নাকে বিন্দু বিন্দু শিশির জটে।

তিলক ফোঁটা রয়েছে আঁকা বাম কপালে
ইচ্ছে জাগে আপন হতে গোপন রাতে।
চিবুক তুলে লজ্জা ভেঙে চুমু খেতে
ষোড়শী দেহ মোহনি বাঁকে চাই হারাতে।

এই মেয়ে তুমি হবে আগুন ?
অসময়ে বৃষ্টিজল কদম ফাগুন।
জানো তুমি আড় চাহনি করে মাতাল
হাসির রেশে তারা ঝরে বাতাস উতাল
কষ্ট ভোলার মন্ত্র মেয়ে ভালোবাসা।

শরতের বরিষনে
মোঃ বদিউল আলম বাচ্ছু

Bodiul-Alom

ভাদ্রের এই রজনীতে হঠাৎ বর্ষন ,
বর্ষার জমানো রাগ ঢেলে দিলে শরতের এই সময়ে ,
আমি বাতায়ন পাশে বসি দেখি অনবরত ,
ঝড় ঝড় শব্দে ঝড়িছে কেমনে ,
মনের কথা মনই জানে ,
গোপন কথা উঠছে মনে অসময়ের এই বরিষনে ,
স্মরনে আসে মোর ,তোমার কথা ভূলিতে নাহি পারি ,
তোমার ক্ষনিকের ভালোবাসা ,
হৃদয়ের চিরতরে গোপনে রয়ে যায় ।

বলেছিলে চিরতরে ভালোবাসিবে মোরে ,
কেনো ছেড়ে গেলে ,
কোন বা দোষে ভেবে নাহি পাই ,
আজ কেনো হায় ,
স্মৃতিরা দৌড়ায় পিছু নাহি ছাড়ে,
ভূলিতে না দেয় তোমায়,
তুমি বলেছিলে যে হাত ধরেছো আজি ,
ছাড়িবে না জীবন গেলে ও তা,
আজ তুমি কোথায় ,
আমি কোথায় বিরাজ করছি ,
বিধাতা জানেন শুধু তা ।

Bangla little magazine

আজ বরিষনের রজনীতে ,
তোমায় শুধু মনে পড়ে ,
তোমার কপালে ভালোবাসার চুম্বন একে দিয়েছিলাম ,
বিধাতা শুধু জানেন,
বিদায় বেলায় দুজনের নয়নের কোনে ,
জলকনা চিক চিক করে উঠেছিলে ,
তা কি মনে নেই,
তুমি বলেছিলে আজীবন রাখিবে মোরে ,
তোমার হৃদয়ের গোপন গভীরে ,
ভূলে যেতে নাহি চাও ,
বিদায়ে সে দেখাটুকু ছিল হৃদয় ছিন্ন করা ,
আমি আজও ভালোবাসি তোমায় ,
জানিয়ে দিলাম ওগো মোর প্রিয়তম ।
শরতেরই কাশবনের ফুটন্ত কাশফুল,
উড়ে যাওয়া পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘগুলি তোমার স্মৃতি ,
ভূলিতে দেনা মোরে ওগো মোর চিত্তের ভালোবাসা,
আজো হৃদয়ের গোপন কোনে রেখেছি তোমার আশা,
একদিন আসিবে ফিরে ভালোবসে জড়িয়ে ধরবে আমায়।

শরৎ ভালোবাসি
এস এম জুনেদ জামান

Juned-jaman

শরৎ বলতে এটাই বুঝি
দোলছে কাশফুল বনে,
স্নিগ্ধ বায়ু লাগছে ভালো
দোল খেয়েছে মনে।

শরৎ বলতে এটাই বুঝি
মন জুড়ানো ভোর,
গাছের ডালে গাইবে পাখি
ভিন্ন গানের সুর।

শরৎ বলতে এটাই বুঝি
ভাদ্র আশ্বিন মাস,
কুয়াশা ঘেরা সকালটাতে
ভেজা দূর্বাঘাস।

শরৎ বলতে এটাই বুঝি
জুঁই-শেফালি ফুটে,
কাশফুলেরা আমায় ধরে
চুমু দেয় যে ঠোঁটে।

শরৎ বলতে এটাই বুঝি
রাতে চাঁদের আলো,
ছুটছে বেড়ায় জোনাকিরা
লাগছে কত ভালো।

শরৎ বলতে এটাই বুঝি
প্রিয়ার নাকের দুল,
ফুল কুড়ানোর ছলে ছলে
বাঁধে খোঁপায় ফুল ।

শরৎ বলতে এটাই বুঝি
রৌদ্র মেঘের খেলা,
এই বুঝিরে বৃষ্টি হবে
চাতক পাখির মেলা।

শরৎ বলতে এটাই বুঝি
প্রেয়সীর মুখের হাঁসি,
তাই তো আমি শরতকে
কত্ত ভালোবাসি।

Bangla little magazine Oct-Dec 2019:

একটি পূর্ণ গ্রাস সূর্য গ্রহণের অপেক্ষায়
দালান জাহান

Dalan-jahan

একটি পূর্ণ গ্রাস সূর্য গ্রহণের অপেক্ষায়
আজও বেঁচে আছি অনিমেষ
মমতার মাস্তুল ভেঙে কখন বাজবে
সেই ভয়ঙ্কর কলিং বেল
যার অপেক্ষায় তোমার দুয়ারে বসে থাকে
দুটি মস্তক বিহীন কালো বিড়াল।

একটি অভিভাবকহীন ফুলের কান্নায়
কখন জাহাজের মতো ভারী হবে বাতাস
কখন তোমার চোয়াল পোড়ে বেরিয়ে আসবে
দাঁত -ওয়ালা আগুনের নদী।
তুমি আগুন মাথায় নিয়ে দৌড়ে আসবে
গলাকাটা কবুতরের মতো
নামহীন বৃক্ষের দুর্ভিক্ষে
তাকিয়ে থাকবে হাজার বছর ধরে।

পৃথিবীর ওজনসম আক্রোশে
একটি ঝরাপাতা চেপে ধরবে
তোমার বোতামহীন শার্টের কলার
তুমি কতোটাই বুঝবে মদ্যপ মহিষ
একদিন যে রমণীর সাদা মাখনে
ফর্সা হয়েছিল তোমার অন্ধকার মুখ।

অনুভূতির উর্বর আগুনে
জ্বলতে জ্বলতে যার জ্বলে না অশেষ….

একটি পূর্ণ গ্রাস সূর্য গ্রহণের অপেক্ষায়
আজও বেঁচে আছি অনিম

Bangla little magazine 2019:

খুঁজে প্রেমের আকাশ
অভিলাষ মাহমুদ

Avilas-Mahmud

মেঘলামন খুঁজে প্রেমের আকাশ এমন শরতে?
চঞ্চল মন অঞ্চল বন খুঁজে কোন হিয়ার পরতে?

হেয়ালি এ মন খেয়ালি কেমন প্রেমিক বিনে কে বুঝে?
কে কীসের আশায় মনোখেয়া ভাসায় কোন মোহনায় প্রেমতরী খোঁজে?

রুপোলি এ রাত খুঁজে সোনালি প্রভাত কোন সে সুখের আশায়?
পাওয়া না পাওয়া হারিয়ে যাওয়া কাউকে কাঁদায় কাউকে হাসায়?

আদরের ধন খুঁজে গীরি বন পেলে খুশি না পেলে মন কাঁদে দিবা নিশা।
আদরের ধন পথ গীরি বন খুঁজে যায় মন, না পেলে হারায় দিক কি- বা দিশা।

মায়ার বাঁধনে হাসি ও কাঁদনে হলে বেলা শেষ যাবে রে বুঝা কে আপন কে বা পর।
পেতে হলে জয় থাকিতে সময় আপনার সেবা কর।

রক্তের ঋণ শোধিতে ক’দিন? ওরে হয় কি আদো শোধ?
ওরে পাগলা মন সামলা তোর কবে হবে সেই বোধ?

প্রেম দিয়ে জয় কর যতো ভয় হ’ রে প্রেমিক খাঁটি,
নইলে জীবনে বিফল সাধনে হবে তোর সব মাটি।

মেঘে মেঘে অনেক দেখি কেটে গেলো বেলা!
না ভেবে আর নতুন করে আবার খেল খেলা।

রবো ভালোবেসে নব আলো এসে আমাদের রাঙাবে,
হে নওজোয়ান হ আগোয়ান বিবেকের ঘুম কে ভাঙাবে?

কতো যে প্রেম কতো যে সুখ আর কতো যে জাগে বাসনা,
কতো হাত ধরি কতো পায়ে পড়ি করি যে কতো সাধনা।

বিবিধ রতন পাইলে যতন করতাম যদি এক খেয়ালে,
হতো না বিফল সাধনা সকল মরিতে হতো না আর টুকে মাথা কোনো দেয়ালে।

তাই ওরে বলি বুঝে শুনে চলি বন্ধুর পথ দুর্গম গীরি নদী,
এখই নে রে শপথ নইলে হারাবি পথ কাঁদবি নিরবধি।

সারাজীবন হোক না শরৎময়
মাসুদা ইতি

Masuda-Etey

এখন আমাদের শরৎ বেলা
তুমি আকাশ আমি সাদা মেঘ
কখনও কাশবন…..
তুমি নীল আর আমি শুভ্র সাদায়..!
সেজেছি মনের অজানা দোলায়…
আমি দিচ্ছি সাড়া তোমার বাতাসে দোলে…
দেখছে দিগন্তে উড়ে যাওয়া পাখী
ভালোবাসায় আকাশ মধুর আলিঙ্গনে
মিশে যায় শ্বেতশুভ্র কাশবনে..!
তোমাতে আমাতে হাওয়ার স্পর্শ
মেঘ ফুলের খেলা চলে শরৎ জুড়ে…!
আকাশ তুমি শুভ্রই থেকো
মেঘ কালো আর নয়..!
শরৎ শুভ্রতায় কাটিয়ে দিবো
সারা জীবন হোক না শরৎ ময়…!

তোমার মন খারাপের বেলায়..
তুমি বৃষ্টি হবে, আকাশ তুমি আমায় ছুঁবে…!
আমি কাশফুল ভিজে লুটুপুটি
লাজে মরি মুখ তুলিনা…
উষ্ম ছোঁয়া দিও তুমি এক আকাশ হেসে…!
আমি আবার দোলবো দেখো…
লাজ শরমের মাথা খেয়ে
তোমায় ভালোবেসে…!

Bangla little magazine

অচেনা এক বৃষ্টিকে
মুস্তাফিজুর রহমান

Mostafizur-Rahman

চিঠি -১


সেদিন একটু রোদ্দুরের জন্য
অপেক্ষা করতে করতে
সারা বেলা চলে গেল
ছেঁড়া ছেঁড়া কলাপাতা ।ফিঙেদের চেঁচামেচি
বার বার মনে করে দিচ্ছিল তোমার কথা
সেদিন তোমার জন্য
অপেক্ষা করতে করতে
ভেঙে গেল হাট
এক মাথা মেঘলা আকাশ
দুপুরের চুড়ুইটা উড়ছে
একবার এদিক একবার ওদিক –
লম্বা চালাঘর ।এক কোনে
ছেঁড়া চট উইপোকা আঁকা ক্যানভাস,
গরুর গাড়িগুলো এক এক করে
ফিরে গেল সব কোলাহল নিয়ে
তখনও আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি তোমায়
– একটু একটু রোদ্দুর,
রাস্তা পার হয় কলো পিঁপড়ে সারি সারি ধূলোবালি ওড়ে, গুমোট বাতাস
ঘামে ভেজা সার্ট, অস্থির সার্টের বোতাম
তখনও আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি
তোমার জন্য –
বটগাছের ঝুরি বেয়ে লতাপাতা হাঁটে
আনমোনা বনফুল সুগন্ধী
হঠাৎ কালো মেঘ জমে ওঠে পশ্চিমে
ঘন কালো মেঘ –
এবার বুঝি তোমার আসার সময় হল…


ধীরে ধীরে বৃষ্টি নামল
এবার বুঝি নৌকা এসেছে ঘাটে
আর তুমি বাঁশ-বাগানের ঝিরিঝিরি
পেরিয়ে আসবে –
তোমার বৃষ্টি ভেজা চুলের খোপা
তোমার বৃষ্টি ভেজা হলুদ আঁচল
আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল বার বার
সেই শিরিষ গাছেদের কথা
যারা তোমার বন্দীকরে রেখেছিল
এক ফালি রোদ্দুরে…


বিকেলটা ঝিমিয়ে এলো
আকাশ মেখেছে গা-ভর্তি জাফরানি রং
সুনসান ফাঁকা রাস্তা
দেরি করে ফেরা পাখিরা দ্রুত ডানা ঝাপটায়
উড়ে যায় গাছে গাছে
নিজস্ব বাসায় …
…………………………………………………………চিঠি – ২

Bangla little magazine

স্পষ্ট একটা নীল চোখ কুড়িয়ে পেলাম
অনন্ত সূর্য রঙের টিপ

প্রচ্ছন্ন ধূলিধূসর মেঘ ঝরাপাতা

তোমার ঠোঁটে ছেঁড়া আধ্-ফোটা কুঁড়ি
বিস্বাদ অশ্রুময়-

শিশির বা শিশিরের মতো স্নিগ্ধ
এক নিবিড় অসম্পর্ক ভাঙা

যুদ্ধের পর যুদ্ধহীন
শরীরের ওপর পড়ে আছে স্তব্ধ রৌদ্দুর

বাতাসের বিপরীতে উড়িয়ে দিই ধূলো

সারি সারি প্রতীক্ষার সাঁঝবাতি জ্বলে

একটা সম্পূর্ণ চাঁদ বা চন্দ্রমুখী
ভিজে যায় রাতের পর রাত
জড়ো করা কিছু ম্লান ঋণ শোধ

আমি চিনি সেই সঠিক চুম্বন
বন্ধ আকাশের দ্বার কিংবা আকাশ বোধ …

অসহায়
শান্তা মরিয়ম

little mag poem
Shanta-Moriom

আর কতো প্রান গেলে শান্ত হবে দেশ?
আর কতো বাবা- মা হবে নিঃশেষ?

দেশ তোমায় ভালোবাসি প্রতিটি প্রেক্ষাপটে,
তোমায় নিয়ে দেখি কতো নানা কিছু রটে।

তোমার বুঝি দুঃখ দশা হবে না আর শেষ?
দুঃখে যেমন সুখেও তেমন তুমি প্রিয়ো দেশ।

পাক-বাহিনী মা বোনদের দেয়নি কোনো মান,
অনেক মা বোন নিজ জীবনের করলো অবসান।
দেশটাকে রক্ষায় কতো বোন হলো পতিতা,
কে দেবে সেই মা বোনদের হলো ক্ষতি যা।

সেই তো ছিলো মাতৃভূমি রক্ষা করার লড়াই,
এগুলোই তো ছিলো গর্ব এদেশেরি ছিলো বড়াই।

আজ তবে এ যুদ্ধ কিসের বুঝতে পারি না কিছু,
নারীরা কেনো হচ্ছে ভোগ্য নিচ্ছে পুরুষ পিছু।

দেশতো আমার হলো স্বাধীন সেই যে অনেক আগে,
নারীর শরীরর খেতে আজও পশুর ইচ্ছে বেশী জাগে।

ওরা কি তবে পাক-বাহিনীর রক্ত দিয়ে গড়া?
তাইতো ওরা আইন মানে না তাদের হয় না নড়া চড়া।

শরতের অবক্ষয়
জেইনাল আবেদীন চৌধুরী ( সৌদিআরব )

little magazine kobita
Zeinal-Abedin

শরতের অবক্ষয় সেতো কবেই হয়েছে!
যেদিন তোমাদের মেকি সভ্যতা তোমাদের গ্রাস করেছে,
আমি দেখেছি নদীর বুকে পাল তোলা নৌকার অবক্ষয়,
মাল্লার দাঁড় টানার ঝুপ ঝাঁপ সুরেলা শব্দের বিলীন ,
মাঁঝির কণ্ঠের ভাটিয়ালি গান হাড়িয়ে যাওয়া,
নদীর পার দিয়ে গুন টানা,
শরতের কাঁশফুল সেতো আজ কল্পনায় জং ধরারই সামীল।
তোমাদের কথিত সভ্যতায় শুধু মেকিতে ভরা;
আন্তরিকতা, স্নেহ-মায়া মমতা ভালোবাসা আজ শব্দে বন্দী।
ইংরেজিতে তোমরা বলো গিভ এন্ড টেক এখন তার ই জয় জয়কার।
কতটা হৃদয় বিদারক, একবার ভেবে দেখো তো, মা-বাবার জন্য বানিয়েছো বৃদ্ধাশ্রম!
কতটা অবক্ষয় হলে এমন অমানবিক উন্নতি তোমাদের হতে পারে?
প্রকৃতির শোভা আর সৌন্দর্য্যের কবর দিয়ে রচনা করেছো আধুনিক শহর,
যেখানে নেই কোন প্রতিবেশী, ভালোবাসার মমত্ব, আছে দুটো শব্দ হায় আর হেলো।
তোমরা আজ বুভুক্ষ, সব খেতে প্রস্তুত, অর্থ আর সম্পদের মোহে এক দৌড় প্রতিযোগিতায় দৌড়াচ্ছ ,
গন্তব্যের নেই কোন সীমানা, তাইতো তোমাদের শান্তির স্থলে সুখের প্রাচুর্য্য।
পান্থা-ইলিশ আজ তোমরা ফ্যাশন করে খাও, যা ছিল বাঙালির প্রাণের খাবার।
মুখে আছে বড় বড় বুলি, অসৎ পথে অর্থ আর সম্পদে করছো ভারী যার যার ঝুলি,
মনুষত্বকে বিসর্জন দিয়ে লাশের উপর হামাগুড়ি চলছো ছুটে মরীচিকার পিছনে ;
অর্থের মানদন্ডে যদিও তুমি ধনি, মনুষত্বের ম্যাপ কাঠিতে তুমি নর্দমার পঙ্কিল কীট।
জাগাও তোমার ঘুমন্ত মানবতাকে, প্রকৃতির রূপে হয় যদি মুগ্ধ তাহলেই ফিরে পাবো শরতের মনোভিরাম সৌন্দর্য্য।
স্বার্থক ও ধন্য হবে আমাদের জন্ম, মানুষরূপী পশুর হবে পরাজয়, মনুষত্বের হবে চির জয়।
শরতের কাশফুলের শুভ্রতায় সব কালিমা যাবে ধুঁয়ে মুঁছে, তাই যেন হয় আগত শরত।
মানুষ মানুষের জন্য, যবে হবে এমনটি, তবেই হবে মোদের মানব জীবন ধন্য।
এসো আজ করি মোরা এই শপথ,
অন্যায়ের কাছে হবো না কভু নত।।

ভাবনার আকাশে সাদা মেঘ
আব্দুল বাসেত

Bangla little magazine kobitay jagoron
Abdul-Baset

অর্পিতা!
মধ্য আশ্বিনেও তোমার দেখা মেলেনি
বলেছিলে, ঈশানকোণে সাদা মেঘ জমা হবে
যেন তাবৎ সাদার মেলায় ভূপৃষ্ঠ মার্বেল
রঙে থৈ থৈ করবে……!
তারপরেই আচম্বিতেই তোমার আগমন ঘটবে
অনেকটা রাজসিক ভঙ্গীতে।
জানো অর্পিতা, আশ্বিনের প্রথম দিন থেকেই
ঈশানকোণে চাতকের মত আমার চেয়ে থাকা
না, অর্পিতা ভেবোনা হাল ছেড়ে দিয়েছি
অথবা তোমাকে মনে রাখার কোন দায় নেই,
সবই ঠিক আছে ………
এছাড়া আমার কিই বা করার আছে
আমি শুধু প্রতীক্ষা করতে পারি,
জেগে থাকতে পারি প্রহরের পর প্রহর।

তুমি ফিরলে একবার নৌবিহারে যাবো
কতদিন যাওয়া হয়নি বলো তো…..
জোছনা মেখে জোছনা রাতে ঠিক চলে যাবো।
এবারে কিন্তু তোমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়বো আর তুমি একের পর এক কবিতা, গান গেয়ে শুনাবে।
না, অর্পিতা তোমার কোন কথায়
এবার শুনবো না……..!!!!!!

Bangla little magazine kobita:

অরুণিমার শরৎ আকাশে
রিলু রিয়াজ

bangla kobita
Rilu-Riaz

অনেক প্রশ্নের উঁকি ঝুঁকি – মেলিনি উত্তর
না বলা কথা গুমড়ে কাঁদে বুকের ভেতর।
সাগরে বেঁধেছি শয্যা- অগনিত কান্নার ভিড়
লক্ষ্যবস্তু আমাতেই স্থির -বাঁকালে ধনুকের তীর।

নি:সঙ্গতার যাঁতাকলে হয়ে আছি জীর্ণ
খসড়াতে অভিন্ন আমি -পরিচ্ছন্নে ভিন্ন।
বিশ্বাসের বেড়ীবাঁধে সন্দেহ উপচে পড়ে
বিবর্ণ ক্ষতরা পৈশাচিক উল্লাসে ফেরে।

জীবনের রোজনামচায় কত কিছু বদলে যায়
তাই কি বদলে গেলে তুমি- বেলা অবেলায়?
অরুণিমার শরৎ আকাশ-আমি ভাসমান মেঘ
একাকি চলেছি হেঁটে- শিঁকে তুলেছি আবেগ।

শরৎ
শক্তিপ্রসাদ ঘোষ (ভারত)

kavita jagran
SAKTI-PRASAD-GHOSH

গ্রীষ্ম বর্ষার ধূসর অতীত
ছায়া নেমে আসে
শরৎ
উপাসনার ঝুলবারান্দা
জুড়ে
পাহাড়ের নীল মেঘ
ধূ-ধূ করে
শীতের ইশারা
মধ্যবয়সী মায়ের
জল তুলে রাখে
আলপনার
বটের মত বাবা
ছাতা খুলে রাখে
শিরোনামে পুজোর বার্তা।

মানবতার বন্ধু
আসলাম প্রধান

Bangla little magazine dhaka

Bangla little magazine
Aslam-Prodhan

হে পুরানো, গৌরবর্ণ
অট্টালিকা- বাড়ি
পাহারাতে, জড়সৈন্য-
রাজ্য-জমিদারি,
শত শত বর্ষব্যাপী-
সাক্ষী আজো তারি !
থেকো সাক্ষী-
আরো বহুকাল
রেখো ধরে
ইতিহাসের হাল ।

আছি লক্ষ-কোটি প্রজা
রাজা থেকে দূরে-
ঠিকানা কী ? অল্পস্বল্প
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুঁড়ে
সর্বঘরে সুখ-দু:খ,
স্বপ্ন রাখা মুড়ে !
স্বপ্নগুলো
শক্ত-কঠিন, ইট-
দন্ত ভাঙে
উই-পতঙ্গ, কীট !

ছদ্মবেশি-স্বার্থান্বেষী-
তদ্দ্বারা শাসিত
কুশাসনে অস্থিমজ্জা
সর্বদা কম্পিত
শিরা-উপশিরা দ্রোহ-
রক্ত প্রবাহিত !
সামর্থ্য কার,
তুলে একটি হাত !
বে-ইনসাফে
করবে প্রতিবাদ!

বজ্রকণ্ঠে মহাবীর
ভাষণ দাগাল!
ঘুমন্ত বাঙালি, ডেকে
জাগাল, ওঠাল !
অনন্ত বৈষম্য, দৈন্য
দুর্দশা পাল্টাল !
কণ্ঠ’টি কার ?
নেতা শেখ মুজিব-
মানবতার
সজন সে, পার্থিব!

আর্তনাদ
সাকিব জামান

Bangla little magazine
Shakib-Jaman

লুকিয়ে আমি আমার মায়ের শাড়ির আচল তলে
মরতে আমি চাইনাকো ভাই বাচবো এ কৌশলে
আর কতকাল অনিরাপদ আমার মাতৃভূমি
রক্ষা করো ওগো মাবুদ রক্ষা করো তুমি ।

আমিতো ভাই দুগ্ধশিশু মায়ের কোলে থাকি
মায়ের আচল তলে শুয়ে নানান স্বপ্ন আঁকি।
বাবা কোথায় ? তাঁর সাথেতো হয়নি পরিচয়
কোন অভিমান নিয়ে তিনি করছেন অভিনয়!

বাবা বোধহয় বাজার থেকে আনবে নতুন গাড়ি
নয়তো পুতুল নতুন পোশাক নিয়ে ফিরবে বাড়ি।
অস্ফুটে কে বললো যেনো বাবাই আমার নাই
বাবা ছাড়া ভাললাগে কি বলতো কেমন হয় ?

বাবা নাকি সত্য পথে জিবন দিছেন ঢেলে
মাকে তিনি বলে গেছেন জিবন দিবে ছেলে
তবে কেন মায়ের কোলে আর লুকিয়ে থাকা
মুক্ত করতে মাতৃভূমি মায়ের আচল ফাকা ।

শারদীয় রাতের মিছিল
গোলাম রব্বানী টুপুল

little magazine
Golam-Rabbani

রাতের আকাশে হেলে শারদীয় চাঁদ
চারিদিকে নিজঝুম আঁধারের হাত
বন্দি নগরী আজ দিশে-কূল হারা
সুখহীন পাখি গুলো ভুলোমন সারা।

নদীর কিনারে দোলে কাশফুল শত
কতজন এসেছিল আজ তারা গত
ভোর ভোর পূবাকাশ লালিমা ফোটে
কোথা’হতে এলো পাখি সঙ্গী সে জোটে।

রাতের প্রহর ছিল রহস্যে ঘেরা
ঘুম-ঘোর বিছানায় স্বপ্নের ডেরা
জানালা গলে নামে জোসনার ঢল
এমন নিশীথ সখা সুখ বেনোজল।

Bangla kobita

মুক্তিযুদ্ধের ফসল
অর্ণব আশিক

kobita jagoron
Arnob-Ashik

আমাকে জ্ঞান দিবেন না, নীতিবোধ শেখাবেন না
যেদিন হনুফার একমাত্র যুবা ছেলেটিকে রাজাকার ধরে নিয়ে গেল
হরিদাসির কিশোরী মেয়ে আলোমতি হলো ধর্ষিতা
কোথায় ছিল আপনাদের জ্ঞান নীতিবোধ?
অনেক দেখেছি, ৫২ ভাষা আন্দোলন,
৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এর জলোচ্ছাস-নির্বাচন; কী না দেখেছি।
শুনেছি নেতাদের উন্নয়নের কথা, দেখেছি স্বার্থের হানাহানি
শুধু ভোট পাওয়ার গলাবাজি, ক্ষমতা দখলের কারসাজি
দেখেছি ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ- হনুফা আজ নি:সন্তান, আলোমতি বদ্ধ উন্মাদ
রাজাকার কেরামত মুন্সী পতাকাবাহী গাড়ীতে চড়ে
দাড়োয়ান হযরত আলী বড় শিল্পপতি
মুক্তিযোদ্ধা কামাল শেখ হাসপাতালের ফ্লোরে ধুকছে
ঔষধের অভাবে মৃত্যুর প্রহর গুনছে।

Bangla little magazine

রহিমদ্দি হাজরা চুয়াত্তর বছর বয়সে এক হাতে রিক্সা চালায়;
যুদ্ধে সে হারিয়েছে একটি হাত, দুটি জোয়ান ছেলে, স্ত্রী-যুবতি কন্যা
কোথায় ছিল সে সময় এই জ্ঞান, নীতিবোধ ?
স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরও, রাত পোহালেই শুনি খুন জখম রাহাজানি গুমের খবর,
সাহসি সাংবাদিক সাগার-রুনিসহ অসংখ্য সাংবাদিকের খুন রহস্যাবৃত, বিচার নাই।
খুন হয় মুক্ত মনের মানুষ ড:হুমায়ুন আজাদ, অভিজিত রায়।
আমাকে জ্ঞান দিবেন না নীতিবোধ শেখাবেন না
আমি মানুষ, আমি বুঝি মানুষের মধ্যেই জ্ঞান আর নীতিবোধের অবস্থান
মানুষের মধ্যেই আমি আমার জ্ঞান আর নীতিবোধকে খুঁজি;
রাজনীতির নীতিকথা নয়,
স্বাধীনতার বিবর্ণ ছবি নয়
রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জীবনানন্দ
আর শেখ মুজিবের সোনার বাংলা চাই।

বিজয়ের চেতনা
মাহবুব আহমেদ

Bangla little magazine
Mahbub-Ahmed

ষোলই ডিসেম্বর ঊনিশ’শ একাত্তর
একটি স্মরণীয় দিন।
এ দিনে হয়েছিলাম
আমরা শত্রুমুক্ত
চোখে ছিল সোনালী স্বপ্ন
স্বাধীনতার স্পর্শে ছিলাম বিমোহিত
ভেবেছিলাম
হাসি আর আনন্দে
ভরে উঠবে জীবন
সুদৃঢ় হবে প্রীতির বন্ধন।
কিন্তু কি হয়েছে?

হয়েছে মনুষ্যত্বের চরম অবক্ষয়
নৈতিক চরিত্র কলংকময়।
ফলশ্রুতিতে
হিংসা বিদ্বেষের রাজত্ব
জাতীয় সত্ত্বা ম্রিয়মাণ ।
তাই আসুন

নিঃস্বার্থ দীক্ষায় হই উজ্জীবিত
ছিনিয়ে আনি বিজয়ের
সেই দুর্লভ অমৃত।।

শ্রেষ্ট অবদান
মোবাশ্বীর হোসাইন

bangla kobita
Mobassher-Hossain

রক্ত গেলো বিজয় এলো
গেলো কত প্রাণ,
তিরিশ লক্ষ শহীদানের
শ্রেষ্ট অবদান।

জীবন দেয়া নয়তো সহজ
রক্ত দিতেও চায়না,
দেশের জন্য জীবন দিলো
নেইতো কোনো বায়না।

মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে
দৌড়ে গেলো রণে,
সেই স্মৃতিটা দেয় যে নাড়া
আজো সবার মনে।

তারাই ছিলো বীর সাহসী
তুচ্ছ করে প্রাণ,
ইতিহাসে শ্রেষ্ট হলো
জীবন করে দান।

Bangla little magazine

বিদ্যাসাগর- ফিরে দেখা দু’শ বছর
সবুজ সরকার (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত)

Bangla little magazine
SABUJ-SARKAR

দু’শ বছর বড় কম সময় নয়
যে পথ ছিল মেঠো, শ্বাপদ সঙ্কুল
ঠ্যাঙ্গাড়েরা অপেক্ষায়, নতুন শিকার;
চৌরাস্তা নিয়ত ছোটে আজ নিয়ন আলোয়
অশান্ত, উদ্ভ্রান্ত মনে, হৃদয় বিকার ।

দু’শ বছর বড় কম সময় নয় ।

অজ্ঞতার মাইল ফলক ছোঁয় রুপকথা পরী
ক্ষীণ দেহ, আধ-পেটা ওজস্বী-মন,
অতিসাধারণ মাঝে যেন হীরক দ্যুতি
হে বাঙালী, তোমায় আজও বুঝতে না পারি ।

বড় কাজ আসলে একার,
যত বড় বাধা তত খিদে বাড়ে
পেছনে টানার শক্তি আজও পিছু নেয়
এখনো সময় আছে ফিরে এসো দ্বারে।

দু’শ বছর বড় কম সময় নয় !

বিজয় মিছিল
ওয়াহিদ আল হাসান

Bangla little magazine
Wahid-Al-Hasan

বছর ঘুরে ডিসেম্বরে
আসলে একটি দিন
ষোল তারিখ বীর বাঙালির
বাজে কানে বীণ।

বিজয় কেতন উড়লো যেদিন
মুক্ত বাতাসে
নতুন সুরুজ হাসলো সেদিন
পূবের আকাশে।

রক্ত নদী শেষে পেলাম
লাল সবুজের দাগ
মা হাসে বাবা হাসে
ভাঙছে বোনের রাগ।

বিজয় মিছিল হচ্ছে শুরু
আয়রে তোরা আয়
শিশুকিশোর দলে দলে
ডাক যে দিয়ে যায়।

আমার কেউ নেই—–
সাহিদা রহমান মুন্নী

Bangla little magazine
Shahida-Rahman-Munney

হিম হিম মৃদু মন্দ বাতাস মাঝে মধ্যে হীরক দানার মতো অল্প স্বল্প শিশির বিন্দু রুপালি নূপুর পায়ে আষ্টে জড়িয়ে ধরে—

শীতের আগাম বারতায় জমে যাচ্ছে মন কিবা স্বপ্নীল অনুভূতি- কিছুতেই স্বপ্ন ঘুড়ি উড়তে চাচ্ছে না গতিয়মান পৃথিবীর আকাশে—

শরীর থেকে চন্দন হলুদের গন্ধ শুকায়নি, মাত্র গাঢ়ত্ব পাচ্ছিল মেহেদীর রং, যৌবনের উষ্ণ নিঃশ্বাস প্রথম বারের মতো বুঝতে চাচ্ছিল শীতের কম্পন!

ঠিক তখনি মিলিটারি ট্যাংক নিয়ে শতশত বুট জুতার শব্দে, বুলেটের শব্দে চারিদিকে তীব্র মাতম শোনা যাচ্ছিল, বাঁচাও -বাঁচাও ছাড়ো ছেড়ে দে শয়তান!

থমকে গেলাম আমি, অনুভবে বিভোর বন্ধ চোখ খুলে শুধু একটিবার চেয়ে দেখলাম তোমায়, কি যেন বলবে তুমি, আমিও কোন কিছু না ভেবেই তোমার চরণ ধুলি নিতে নোয়ালাম শরীর বাড়ালাম হাত, ওমনি আজরাঈলের হুংকারে দুয়ার ভেঙে

ছুটে এলো ১০/১২ জন, না ১৫/২০ জন, না-না ২৫/৩০ জন দানব চুলের মুঠি ধরে ছুড়ে ফেলল ফুলসজ্জার ফুলেল বিছানায় —চোখের সামনেই ডলে, মচলে কুচঁলে দিল তোমায় কুকুর বিড়ালের চেয়েও নির্মমভাবে! তোমার শরীর শীতল হবার আগেই হিম করেদিল আমায়, আমার সবকিছু, সবকিছু!

ভোতা অনুভূতি নিয়ে জীবন্ত লাশের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছি সেই ৭১ থেকে আজো,এখোনো প্রতিনিয়তই—চারিপাশের সব কিছু আজ বিবর্ণ হয়ে গেছে,সমাজ বর্জিত বিরাঙ্গনা আমি!

আজ পৌষের হিমহিম শীত আবার এসেছে,আমি শুধু সেই হিম হয়েই রয়ে গেলাম!চারিপাশে সবার সব আছে,সবই আছে, শুধু আমার কেউ নেই, কিচ্ছু নেই!লাল সবুজের তপ্ত আগুনে পোড়া জীবন্ত লাশ আমি, আমার কেউ নেই—–

Bangla little magazine short story:

ছোট গল্প

শোভনার চারুচন্দ্র বোস
আর একজন টিংকু

– বিশ্বাস মিলি

Bangla little magazine
Biswas-Mili

ফার্স্ট ইয়ারে পড়তো টিংকু। কতই বা বয়স। এই ধরো ১৬ বছর হতে পারে টেনে টুনে। খুলনার সিটি কলেজে পড়াশুনা করতো সে। যদিও কলেজের এখনকার নাম সরকারি মজিদ মেমোরিয়াল সিটি কলেজ কিন্তু খুলনার সাধারণ মানুষ জানে সিটি কলেজ হিসেবে। দুষ্টের শিরোমনি বলতে যা’ বোঝায় টিংকু ছিল তা’।
এইটুকু বলেই থামলেন ছালাম চাচা। এবারের ২৬শে মার্চে উমেশচন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাচ্ছিলেন তিনি। গল্প বলতে গিয়ে এভাবেই কাহিনীটা শুরু করেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম, সবার প্রিয় ছালাম চাচা।

Bangla little magazine

-আমি ওকে জন্ম থেকেই চিনতাম। শফিক সাহেবের একমাত্র ছেলে। তখন খুলনা এ্যাত্তো বড় মহানগর হয়ে ওঠেনি। ছোট্ট সাজানো গোছানো একটা শহর। কালেক্টরি, জিপিও, এসপি অফিস, হাসপাতাল, জেলখানা, ফায়ার ব্রিগেড, সার্কিট হাউস, থানা, পার্ক, স্টেডিয়াম- সব কাছাকাছি। যেন যা’ দরকার দু’ পা’ হেঁটেই পাওয়া যেতো সব। আর খুলনার প্রাণকেন্দ্র বলতে যা’ বোঝায় তা’ ছিল পিকচার প্যালেস মোড়। আশিয়ানা হোটেল, ডিলাক্স হোটেল খাওয়ার জন্য আর হোটেল সেলিম থাকার জন্য সবচেয়ে নামকরা ছিল তখন। আর মিষ্টির দোকান হিসেবে খ্যাতি ছিল বড় বাজারের ওয়েস্ট মেকট রোডের নিরাপদ ঘোষ।

শফিক সাহেবরা বড় মীর্জাপুর থাকতেন। ফাঁকা ফাঁকা ঘর-বাড়ী। প্রত্যেক বাড়ীতেই নানান ফুল ফলের গাছ। টিংকু সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকতো এর বাড়ী ওর বাড়ী থেকে ঢিল ছুড়ে আম, জাম, বড়ই পেড়ে খাওয়া আর বাগান থেকে চুরি করে ফুল ছেঁড়ায় ব্যস্ত। ওর কাছে বই খাতার চেয়ে গুলতি, লাটিম, লাটাই-ঘুড়ি, মার্বেল অত্যন্ত প্রিয়। সে ফেলে দেয়া সিগ্রেটের প্যাকেট দিয়ে তাস খেলতো। তোমরা কি এখনো এ সব খেলা খ্যালো?

প্রশ্নটা সবার উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিয়ে আবারও বিরতি নেন ছালাম চাচা। ছোট ছোট সোনামনিরা বললো, তারা তাস খেলাটা জানে না। বাকি সব চেনে কিন্তু নিজেরা কখনো ব্যবহার করেনি।
-টিংকুর বিরুদ্ধে তার বাবার কাছে প্রায়ই নালিশ আসে। একমাত্র ছেলে হওয়া সত্বেও শফিক সাহেব বেশ কড়া শাসনে রাখতেন টিংকুকে। কিন্তু সে শাসন টিংকুকে দুষ্টুমি থেকে সরাতে পারেনি কখনো। তবে সে কিন্তু স্কুলে যেতো নিয়মিত। স্কুলে থাকাকালেও অবিরাম চলতো তার দুষ্টুমি। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত এপিসি স্কুলে পড়াশুনা করে সে ক্লাস সিক্সে এসে ভর্তি হয় বিকে স্কুলে। বিকে স্কুলেই তার দুষ্টুমি চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। টিংকুর কারণে কি-না জানি না, বিকে স্কুলকে অনেকেই তখন বলতো, বান্দরের কারখানা।

-বিকে স্কুলে ক্লাস শুরু হওয়ার প্রথম দিনেই সহপাঠী আর শিক্ষকরা টের পেয়ে যান টিংকু কি জিনিষ! টিংকু তার এই স্কুলের প্রথম দিনেই ব্ল্যাকবোর্ডে পণ্ডিত স্যারের কার্টুন এঁকে, সামনের বেঞ্চের সহপাঠীদের জামায় ফাউন্টেন পেনের কালি ছিটিয়ে, একজনের সাথে মারামারি করে তার উপস্থিতি জানান দেয়। বেত হাতে করে হেডস্যারকেও ছুটে আসতে হয় টিংকুর জন্য। প্রথম দিন বলেই বেতের বাড়ি থেকে মাফ পেয়ে যায় টিংকু। হেডস্যার জন স্যারকে নির্দেশ দেন তিনি যেন টিংকুকে সব সময় নজরে রাখেন।

kobita jagoron

-পরদিন এ্যাসেম্বলিতে টিংকুকে ডাকা হলো জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার জন্য। যথারীতি সাফল্য দেখালো টিংকু। অবলীলায় গেয়ে গেল “পাক সার জামিন সাদ বাদ/ কিসওয়ারে হাসিন সাদ বাদ/ তু নিশানে আজমে আলী শান………………”। থামেন ছালাম চাচা। স্পিচ ডায়াসে রাখা পানির বোতলের ছিপি খুলে দু’-তিন ঢোক পানি খেয়ে নিয়ে আবারও বলতে শুরু করেন-
এতো গেল তার স্কুলজীবনের গল্প। এবারে মূল কাহিনীতে মানে তার কলেজ জীবনের ঘটনায় আসি। কলেজে ওঠার পর দুষ্টুমি আরও বেড়ে যায় টিংকুর। এখানেও সবাই জেনে যায় টিংকুর নাম। কলেজে সেদিন প্রথম ক্লাসটি বাংলা থাকলেও সুনীল স্যার অসুস্থতার কারণে স্কুলে গরহাজির থাকায় ইতিহাসের পরিমল বাবু ক্লাসে এলেন। তিনি ইতিহাস পড়ান।

-পরিমল বাবুও জেনে গিয়েছিলেন টিংকুর কথা। তিনি প্রথমেই জানতে চাইলেন, টিংকু কে? টিংকু উঠে দাঁড়ালো। পরিমল বাবু তাকে বসতে বলে ক্লাস শুরু করলেন। ‘তোমরা সবাই জানো, আমাদের দেশ পূর্ব পাকিস্তান।’ এক সময় এই দেশটি শাসন করতো বাঙালিরা। তারপর মোগলরা দীর্ঘদিন ধরে এ দেশ শাসন করেছে। রাজা বা নবাবরা মোগলদের কর পরিশোধের মাধ্যমে এ দেশ শাসন করতো। এর পরে ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশরা এ দেশ দখল করে নেয়। আর প্রায় দু’শ’ বছর ধরে সাদা চামড়ার মানুষগুলো আমাদের উপর শোষণ, শাসন, নির্যাতন চালায়।
পরিমল বাবু বলে যান, আজ যে দেশটা পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত সেই দেশের মানুষ বাংলায় কথা বলে। তারা চিরকাল সব জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছে। আমাদের প্রিয় শহর খুলনা এবং এই খুলনা জেলার মানুষেরও রয়েছে সংগ্রামের ইতিহাস। এই জেলার মানুষও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম করেছে, জীবন দিয়েছে, ফাঁসিতে ঝুলেছে। আর তার বিনিময়েই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি।

পরিমল বাবু বলেন, আজ তোমাদের শোনাবো এই খুলনা জেলার একজন মহান সংগ্রামীর কথা। তোমরা কি শোভনা নামের কোন গ্রাম চেনো? পরিমল স্যারের প্রশ্নের উত্তরে কয়েকজন হাত তোলে। তাদের সবার বাড়ীই ডুমুরিয়ায়। তারা বললো যে শোভনা ডুমুরিয়া থানার একটা গ্রাম। ঐ গ্রামটি যে ইউনিয়নে অবস্থিত তার নামও শোভনা।

Bangla little magazine

-আচ্ছা, শোভনার কোন সংগ্রামীর নাম বলতে পারবে? সবাই চুপ। পরিমল বাবু বলেন, সেই সংগ্রামী মানুষটার নাম চারুচন্দ্র বসু। ১৮৯০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চারুচন্দ্র বসু জন্মগ্রহণ করেন খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থানার শোভনা গ্রামে। তাঁর পিতার নাম কেশবচন্দ্র বসু। চার ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয় চারু বসু জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধী ছিলেন। তাঁর ডান হাতটি ছিল হাঁসের পায়ের পাতার মতো মোড়ানো। খর্বকায়, অসুস্থ, ছিপছিপে পাতলা দেহগড়নের এই তরুণ স্বভাবে ছিলেন বুদ্ধিদীপ্ত, ক্ষুরধার ও প্রতিবাদী। স্বাধীনতা আন্দোলনের সেই অগ্নিগর্ভ দিনগুলোতে সারা ভারত জুড়ে বিপ্লবীদের বীরত্বপূর্ণ কর্মকান্ডে ইংরেজ সরকার ভীষণভাবে ব্যতিব্যস্ত। জীবনের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনের অগ্নি শপথে বলিয়ান বাঙালি তরুণ যুবকের দল বৃটিশ সরকারের উপর নানাভাবে চোরাগুপ্তা হামলা চালিয়ে তাদেরকে তটস্থ করে রেখেছিল। একই সঙ্গে ইংরেজদের অনুগত বাহিনীর দমন-পীড়ন এবং তাদের কিছু এদেশীয় দোসরদের অপতৎপরতা সমানভাবে বাড়তে থাকে।

পরিমল বাবু বলেন, এখরকার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আলীপুর ও মুরারীপুকুর বোমা হামলাসহ অন্যান্য মামলায় ইংরেজ সরকার পক্ষের উকিল ছিলেন আশুতোষ বিশ্বাস। তিনি সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন বিপ্লবীর শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের সহায়তা করতেন। বৃটিশ সরকারের একনিষ্ঠ সমর্থক এই আইনজীবী নিজেই আগ্রহী হয়ে তার দাপ্তরিক কর্মের বাইরে গিয়েও স্বেচ্ছা প্রণোদিত হয়ে বৃটিশ পুলিশকে বিভিন্ন রকম সহায়তা দিয়ে যেতো স্বদেশী আন্দোলনকারীদের ধরার জন্য। আশু উকিলের এই জঘন্য কর্মকা-কে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে স্বাধীনতা বিরোধী ভূমিকা হিসেবে পরিগণিত হয়। তাঁরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন কুখ্যাত বৃটিশ-দালাল আশু উকিলকে হত্যা করা হবে। স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যুবক চারু বসু সানন্দে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

little magazine:

সেদিন যেন কথায় পেয়েছিল পরিমল স্যারকে। তিনি বলে যেতে থাকেন- চারু বসু তাঁর পঙ্গু ডান হাতে খুব শক্ত করে রিভলবার বেঁধে নিয়ে গায়ে চাদর জড়িয়ে আলিপুর আদালত প্রাঙ্গণে যান। দিনটি ছিল ১৯০৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। উপযুক্ত সময়ের জন্য তিনি অপেক্ষা করেছিলেন। বিকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করার পর আদালতের পশ্চিম পাশে তিনি তাঁর লক্ষ্যবস্তু আশু উকিলকে পেয়ে যান এবং সঙ্গে সঙ্গে বাম হাত দিয়ে ট্রিগার চাপেন। আক্রান্ত ব্যক্তি চিৎকার করতে করতে দ্রুত দৌড়াতে থাকেন। চারু বসু আবার গুলি করেন এবং ঘটনাস্থলেই মারা যান আশু উকিল। ততক্ষণে সুরক্ষিত আদালত প্রাঙ্গণে চারু বসু পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। চারু বসুর বিয়ের দিন ঠিক হয়েছিল ৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু হবু স্ত্রীকে স্বাধীনতা সংগ্রামের কঠিন পথে চলার কথা বলে বিয়ের নির্ধারিত দিনের আগেই বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। ১০ ফেব্রুয়ারি জানা গেল সরকারি উকিল আশু বিশ্বাসকে হত্যা করেছেন সেই ঘর পালানো তরুণ চারু বসু।

Bangla little magazine Dhaka

পরিমল স্যার বলতেই থাকেন- বৃটিশ সরকার চারু বসুকে গ্রেফতার করে তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করে। তাঁকে গ্রেফতার করা গেলেও তাঁর মুখ থেকে অস্ফুট হাসির রেখাটিকে কখনও দমন করা যায়নি। বিপ্লবীদের সম্পর্কে তথ্য বের করার জন্য জেলখানায় তাঁর উপর ভয়ানক রকম অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। শারীরিক প্রতিবন্ধী চারু বসু সেই নির্মম শারীরিক নির্যাতন মুখ বুঁজে সহ্য করেছেন। কিন্তু তাঁর সহকর্মী এবং সংগঠন সম্পর্কে একবিন্দু তথ্য তিনি মুখ থেকে বের করেননি। শারীরিক দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও তিনি কোন রকম অনুকম্পা প্রার্থনা না করে বরং সর্বদা নিজের আদর্শের প্রতি সুগভীর আস্থা রেখেছিলেন।

পরিমল স্যার ক্লাসে আরও বললেন, চারুচন্দ্র বসুর বিরুদ্ধে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯০৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ বাম্পসকে লক্ষ্য করে চারু বসু বলেছিলেন, ‘না কিছুই আমি চাইনে। সেশন-টেশনের প্রয়োজন নেই। বিচার করে কালই আমাকে ফাঁসি দাও। এটা ভবিতব্য যে, আশু বাবু আমার গুলিতে নিহত হবেন এবং আমি ফাঁসি কাঠে প্রাণ দেব।’ আদালতের কার্যবিবরণী শেষ হয় ১৯০৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। মামলার বিচারে তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুর সাজা দেওয়া হয় এবং ঠিক তার পরদিনই তাঁর মৃত্যুদণ্ডের কথা শোনানো হয়। তিনি তা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বলেন। দোসরা মার্চ তাঁর বিচার হাইকোর্টে তোলা হয়। ১৯০৯সালের ১৯ মার্চ আলীপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে এই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী শতভাগ দেশপ্রেমিক মৃত্যুঞ্জয়ী বিপ্লবীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।

little magazine story:

এইটুকু বলে থামলেন পরিমল স্যার। তারপর জানতে চাইলেন, তোমাদের ভেতর এমন কেউ কি আছে, যে দেশের জন্য, এই দেশের মানুষের মুক্তির জন্য এমন আত্মবলিদান করার সাহস রাখো? অধোবদনে একটা ছেলে উঠে দাঁড়ায়, ছেলেটির নাম টিংকু। পরিমল স্যারের ক্লাস শেষ হয়ে যায়। সবাই হৈ গৈ করে বের হয়ে যায় ক্লাস থেকে। একটা ছেলে তার আসনেই বসে থাকে নির্বাক হয়ে চোয়াল শক্ত করে। ছেলেটির নাম টিংকু।
তারপর কি হলো, ছালাম আঙ্কেল? শুধায় উমেশচন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে স্কুল পড়–য়া ক্ষুদেরা। সবাই ছালাম চাচার মুখ থেকে তন্ময় হয়ে শুনছিল পরিমল স্যারের সেদিনের ক্লাসের সেই পাঠ। বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম আবারও বলতে শুরু করেন-

-সেদিন থেকেই আমুল পরিবর্তন টিংকুর। পাড়ার লোকেরা অবাক হয়! তাদের গাছে, টিনের চালে আর কেউ ইট মারে না। পাড়াতেই দুরন্ত ছেলেটাকে আর পাওয়া যায় না! কি হলো ছেলেটার? টিংকুকে এখন নিয়মিত পাওয়া যায় সার্কিট হাউস মাঠ বা হাদিস পার্কের সমাবেশ বা জনসভায়। মিছিলের শ্লোগানে তার কন্ঠ ছাপিয়ে যায় অন্যদের। এর মাঝেই এসে গেল একাত্তুরের মার্চ। তেসরা মার্চ জন্মদিন ছিল ওর। ষোল বছর বয়স পুরে যাওয়ার কথা। সেই সময় এখনকার মত ঘটা করে জন্মদিন পালনের রেওয়াজ ছিল না। তবু শফিক সাহেব ভাল-মন্দ রান্না করে ফকির মিসকিনদের খাওয়ালেন দুপুরবেলা। কিন্তু সেখানেও পাওয়া গেল না টিংকুকে।

Bangla little magazine

টিংকু তখন প্রতিবাদ মিছিলে। মিছিলটা ছিল বিশাল। সার্কিট হাউস থেকে মিছিলটা বের হয়। যশোর রোড দিয়ে চলা মিছিলের মাথা যখন পিকচার প্যালেসের মোড় ছাড়াচ্ছে তখনও মিছিলের লেজ সার্কিট হাউসে। মিছিলের সামনের ভাগে ছিল টিংকু। আজ সে নিজেই শ্লোগানে মূল কন্ঠ দিচ্ছিল। হঠাৎ স্টেট ব্যাংক মানে এখনকার বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতর থেকে গুলি চললো মিছিল লক্ষ্য করে। মানুষের চিৎকার, হুড়াহুড়ির মধ্যে কোনমতে দৌড়ে নিজের পাড়ায় পৌঁছায় টিংকু। পরে জানা যায় মুসা সহ তিনজন শহীদ হয়েছেন গুলিতে।

এর মধ্যে কেটে গেল আরো কিছু দিন। শুরু হলো মুক্তির জন্য সশস্ত্র যুদ্ধ। আমরা তখন যুবকদের সংগঠিত করছি। আমাদের সাথে মুক্তিকামী খুলনার অসংখ্য মানুষ। অপেক্ষা করছি নির্দেশনা পাবো নেতাদের কাছ থেকে। তারপর ঝাপিয়ে পড়বো পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে। রাতের বেলা কার্ফ্যু আর দিনের বেলা কয়েক ঘন্টার জন্য চলাচল করার সুযোগ। এর ভেতর আমরা একে একে শহর ছাড়তে শুরু করলাম। আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী রাতের বেলা প্রধান রাস্তা ছেড়ে বিলের ভেতর দিয়ে পায়ে হেঁটে বটিয়াঘাটা থানার কৃষ্ণনগরে বিলের ভেতর মিলিত হলাম আমরা। পাকিস্তানী মিলিটারি এলে আমরা কমপক্ষে এক মাইল দূর থেকেই তাদের গাড়ীর আলো দেখে সটকে পড়তে পারবো।

কৃষ্ণনগরের বিলে রাত ১২টার মধ্যেই কয়েক হাজার মানুষ হাজির হলাম। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত হলো যে, রাতের বেলা বিল পাড়ি দিয়ে আমরা ডুমুরিয়ার চুকনগর গিয়ে পৌঁছাবো। সেখানে আমরা বিভিন্ন বাড়ীতে আশ্রয় নিয়ে রাতে আবার পথ চলা শুরু করবো। এভাবে দিনের বেলা আশ্রয় আর রাতে পথ চলে যত শিগগীর সম্ভব পৌঁছে যাব মুক্তিবাহিনীর রিক্রুট ক্যাম্পে।
আমরা যখন চুকনগরে পৌঁছাই তখন সকাল হয়ে গেছে। হঠাৎই দেখতে পেলাম টিংকুকে। অতটুকু বাচ্চা ছেলে আমাদের মত যুবকদের সাথে পাল্লা দিয়ে সারা রাত ধরেই পথ চলেছে সে। এখন তাকে বাড়ী ফিরে যেতে বললে বিপদে পড়তে পারে সে। তবুও তাকে ফিরে যেতে বললাম। কিন্তু সে কথা শুনলো না। আমাদের সাথেই পা মেলালো সে। তার চোখে বিদ্রোহের আগুন, মুষ্টিবদ্ধ হাতে শপথের দৃঢ়তা আর মুখে দীপ্ত প্রত্যয় দেখে আমাদের দলনেতা তাকে দলে রেখে দিলেন।

Bangla little magazine kobita

এভাবে কেটে গেল আরও বেশ কিছু লম্বা রাত। পায়ে হেঁটেই সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী এলাকায় পৌঁছে গেলাম আমরা। রাতের আঁধারে ছোট্ট সীমান্ত নদী পার হতে হবে সাঁতরে বা নৌকায় চড়ে। এলাকাবাসীরা বললেন, কোন সমস্যা হবে না। পাকিস্তানী মিলিটারিরা এ এলাকায় এখনো ঢোকেনি।
আমাদের ভেতর যারা সাঁতার জানে তারা সাঁতরেই নদী পার হলো। আর যারা সাঁতার জানে না তারা নৌকায় চড়ে পার হচ্ছে। নৌকার সংখ্যা কম থাকায় ছোট ছোট দলে নৌকা পার হতে হচ্ছিল। খুলনা থেকে আসার পথে আমরা বেশ কিছু অস্ত্র এবং গুলি সংগ্রহ করতে পেরেছিলাম। পথে শত্রুর মোকাবেলা করা লাগতে পারে ভেবে ওগুলো নিয়েই পথ চলছিলাম আমরা। সীমান্ত পার হওয়ার সময় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো অস্ত্র এবং গুলি যাবে সব শেষ নৌকায়। যদি কোন আক্রমণ আসে তা’ হলে মোকাবেলার জন্য শেষ পর্যন্ত লড়ার রসদ থাকবে। গ্রামের মসজিদে যখন ফজরের আযান চলছে তখনো ২৫-৩০ জন পারের অপেক্ষায়। এই সময় খুব কাছ থেকে হঠাৎ গুলির আওয়াজ। নিজেকে আড়াল করার তেমন কোন কিছু চোখে পড়লো না। এই সময় সাঁতার না জানা টিংকু একটা দোনলা বন্দুক তুলে নিল নিজ হাতে। নলটা ভেঙে দু’টো গুলি ভরে ফেললো অবলীলায়। আর কিছু গুলি ওর হাফ প্যান্টের পকেটে ভরে নিল। আমি জানতাম ওর বাবার বন্দুক আছে, কিন্তু জানতাম না ও বন্দুকে গুলি ভরতে এবং চালাতে জানে।

টিংকু বললো, আপনারা সবাই নৌকায় উঠে যান। এ গুলি যদি শত্রুপক্ষের হয় তা’ হলে ওদের দু’ চারটেকে শেষ করার আগে আমি যাব না। আর যদি এ গুলি আমাদের পক্ষের হয় তা’ হলে পরের নৌকায় ওদের সাথে আমি আসছি। এই বলে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই ও দৌড় লাগালো। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব কিছু ঘটে গেল। এরই মাঝে পাঁচটা নৌকা ঘাটে ফেরৎ এসেছে আমাদের নিতে। মাঝিরা তাড়া দিচ্ছে নৌকায় ওঠার জন্য। মন থেকে না চাইলেও নৌকায় উঠতে হলো।

আবার গুলির শব্দ। এবারে গুলির শব্দ খুব কাছ থেকে। মাঝিরা প্রাণপণে নৌকা বাইছে। দিনের আলো ফুটে উঠেছে ততক্ষণে। মাঝ নদী থেকে দেখতে পাচ্ছি ৫/৭ জন খাকি পোশাকধারী গুলি করতে করতে ছুটে আসছে নদীর দিকে। ওরা আমাদের দেখতে পেয়েছে। নৌকা লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করলো হানাদারেরা। পাড়ে প্রায় পৌঁছে গেছি। এমন সময় আবারও গুলি। দেখলাম খাকি পোশাকের দুজনকে লুটিয়ে পড়তে। এবার মুষলধারে গুলি ছুটতে শুরু হলো। আমরা সবাই নিরাপদেই ভারতের মাটিতে পা’ রাখলাম। তুমুল গুলির ভেতরই নদীর ওপার থেকে শুনতে পেলাম এক কিশোরের গগণবিদারি আওয়াজ, “জ য় বাং লা”।
#

Bangla little magazine

You Might Also Like

No Comments

Please Let us know What you think!?

Translate »
%d bloggers like this: