করোনায় আক্রান্ত নিখিল

জুলাই ৭, ২০২০
করোনায়-আক্রান্ত-নিখিল-শাহাদাতহোসেন

করোনায় আক্রান্ত নিখিল-শাহাদাতহোসেন

সারারাত ছটফট করে একটুকুও ঘুম আসেনি।যেনো ভিতরে কিসের একটা ভয় আর সংকোচ কাজ করছে।শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ফেলো।ঝিম ধরে আছে মাথাটা।কিন্তু তবুও শুকনো কাশির সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ একটা শ্বাস দিচ্ছে।এতক্ষণ যার কথা বলছি সে নিখিল। পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল ব্যক্তি।বাবা মারা গেছেন প্রায় দু’বছর হলো।এখন পুরো পরিবারটা তার উপরই ভর করে চলছে।ছোট দু’ভাই স্কুল পড়ুয়া আর সাথে ছোট একটা বোন আছে। এদের জন্য নিখিলের জীবন সংগ্রাম। গত দুইদিন যাবত নিখিল অসুস্থ।কর্মক্ষেত্রে নিখিল একজন ভ্যান গাড়ি চালক।মাঝে মাঝে গাড়িতে ভাড়া না থাকলে সেটা বন্ধ করে দিয়ে অন্য কাজ ও করে।পরিবারের কথা ভেবে তাকে লড়তে হয়।

নিখিল বসে থাকার ছেলে না। নিম্নপরিবারের মানুষগুলোর পেট শান্তি তো দুনিয়া শান্তি! পেটের জন্যই যত সংগ্রাম।আজ-দুইদিন যাবত ভিষণ অসুস্থ নিখিল,ঘরে তেমন বাজার-সদায় নেই।ইদানিং এক মারাত্মক ভাইরাসের কথা শুনা যাচ্ছে।যেটা বিশ্বব্যাপি মহামারি আকারে ধারণ করেছে।বাংলাদেশ ও নাকি এর আক্রমণ থেকে বাদ পড়েনি।শুনা যাচ্ছে দুই-একদিনের মধ্যে দেশে লক-ডাউনের সিদ্ধাত্ব আসতে পারে।কিন্তু নিখিল তো লক-ডাউনের আগেই লগ-ডাউন হয়ে পড়ছে,অসুস্থতায় বিছানায় পড়ে কাতরাচ্ছে।কেউ শুনার নেই,দেখার নেই তাদের আর্তনাদ। টাকার অভাবে চিকিৎসকের শরাণাপন্ন ও হতে পারেনি। নিখিলের ভিষণ মন খারাপ থাকলে সে মাঝে মাঝে নিজের সাথে কথা বলে। নিজের সাথে কথা বলতে পারা একটা ভালো গুণ। লক-ডাউনের কথা শুনে নিখিলের চিন্তা আরো বেড়ে গেছে।কিভাবে চলবে তার পরিবার?

করোনায় আক্রান্ত নিখিল-শাহাদাতহোসেন

ছোট দু’ভাই আর একটা বোন মাঝে মাঝে তার কাছে দু’একটা আবদার নিয়ে আসে।কিভাবে মিটাবে তাদের এ ছোট-খাটো আবদারগুলো। সামনে ঈদ,অথচ নিখিলের এ খারাপ অবস্থায় পরিবারের কারো মন ভালো নেই। মা সারাদিন কান্নাকাটি করছে ছেলেকে নিয়ে।কিন্তু তাদের এই কান্নাগুলে দেখার জন্য আশ-পাশের পাড়া-প্রতিবেশী সমাজের কেউ আসেনি।এই সময়টা বড্ড কঠিন,বেশির ভাগ মানুষই নিজেকে নিয়া ব্যাস্ত।ছেলের অসুস্থটা দেখে মা আর থেমে থাকেনি।ছেলের জন্য বের হয়ে পড়ে রাস্তায় ভিক্ষার থালা হাতে নিয়ে। সারাদিন পাড়া-মহল্লা ঘুরে দু-তিন কেজির বেশি চাল জুটাতে পারেনা নিখিলের মা।তবুও তাদের চলছে নিয়মিত মাথা ঘুটিয়ে অতৃপ্তিতে বেঁচে থাকার এ জীবন সংগ্রাম। অন্যদিকে নিখিলের অসুখ বেড়ে গিয়ে দিন-দিন নিখিলের অবস্থার অবনতি হচ্ছে। একেবারে মৃত্যুশয্যায় নিখিল।

দেশ-বিশ্বব্যাপি করোনার প্রকোপ কান্ডে মৃত্যুশয্যায় মানুষ।বাংলাদেশেও রোগী ধরা খেলো অনেক,এই মহূর্তে দেশে লক-ডাউনের ডাক আসলো।
কিন্তু পেটের লক-ডাউন দিবে কে,পেটের তো লক-ডাউন দেওয়া সম্ভব না।নিখিলের মা বের হয়ে যায় প্রতিদিনের মতো নিয়ম করে ভিক্ষার থালা হাতে নিয়ে,কিন্তু আজ তেমন ভিক্ষা করে কিছু জোটেনি।বরঞ্চ অনেকগুলো খোঁচাকথা আর কটুক্তি জুটেছে।মানুষ করোনার আতঙ্কের কারণে অপরিচিত কাউকে তেমন বাড়িতে ডুকতে দিচ্ছেনা। নিখিলের মাকে কিছু পরিবার এখন না আসার জন্য বারণ করেছে,কিন্তু পেটের চাহিদা মেটাবে কে?

সরকার নাকি এ পরিস্থিতিতে কিছু কিছু পরিবারের নিকট খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করছে।কিন্তু নিখিলের পরিবার পায় নি। তাদের এ চাপা ক্ষোভ আর কষ্টের হাহাকার শুনবে কে? না পাওয়ার অতৃপ্তিতে রোজ অগণিত প্রশ্নভান্ডার যেনো থেকেই যায় এমন কিছু পরিবারের!
যার থাকেনা,তার জন্য কোথাও যেনো থাকার কথা না। পরিবারটা আপাতত ক্ষুধায় ধুকছে,কিন্তু সমাজ-বাড়ি এবং বাড়ির আশ-পাশের কেউ তাদের খোঁজ নিতে আসেনি।

কয়েকদিন পর নিখিলের অবস্থার অবনতি ঘটতে লাগলো।পরিবারটা কষ্টের ডগায় ধুকে ধুকে দিন কাটাচ্ছে। অন্যদিকে সারারাত ঘুঙরানো আর ছটফট করে একদিন ভোর সকালের দিকে নিখিলের হঠাৎ ভিষণ শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। ঠিক-মতো কথা বলতে পারছেনা।হঠাৎ তার শ্বাসকষ্ট সময়ের সাথে যেনো আরো এক-ধাপ বেড়ে গেলো,ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস দিচ্ছে।কিছুটা পা তুলে পুরো শরীরটা কাঁপুনি দিয়ে বিছানার এক-পাশ থেকে অন্যপাশে কাতরাচ্ছে নিখিল।

করোনায় আক্রান্ত নিখিল

এ পরিস্থিতিতে নিখিলের মা কি করবে কিছু ভেবে পাচ্ছেনা,একটা ডাক্তারের শরাণাপন্ন হবে যে সে টাকাও নেই।মা কিছু করতে না পেরে অনেক চিৎকার করে নিজে নিজে কান্নাকাটি করা শুরু করলো। কিন্তু হঠাৎ করে সব কান্না থেমে যায় কিছুক্ষণের জন্য,পিন-পতন শব্দ নেই সেরকম নিস্তব্দ চারপাশ আর সন্ধ্যাবেলার অন্ধকারে যেনো পুরো ঘরটা গিলে খেলো ।মা নির্বাক ভঙ্গিমায় নিস্তব্দ নিখিলের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়েই রইলো,নিখিলের কোনো নড়-চড় নেই। নিখিলের ছোট ভাইগুলো নিখিলের হাত ধরে টানাটানি করছে,কিন্তু কোনো সাড়া-শব্দ পাচ্ছেনা।ছোট-ভাই আর বোনটা কাঁদছে।বাড়ির লোকজন জড়ো হয়েছে এবার,যেনো তারা সবাই দাঁড়িয়ে থেকে আপাতত সিনেমা দেখছে।কিন্তু এ জীবন তো সিনেমা নয়,বরঞ্চ সিনেমার থেকেও বড় কিছু।তবুও বলা যায় কিছু সিনেমা জীবনের একটা অংশ।জীবন থেকেই সিনেমার উৎপত্তি।

সবার জড়ো হওয়া আর চিৎকার চেঁচামেচি দেখে পাশের বাড়ির রহিম সাহেব আসলো।রহিম সাহেব মোটামুটি পাড়া-মহল্লায় সামাজিক কাজ-কর্ম করেন বলে এলাকায় খুব পরিচিত এবং সুনামধন্য ব্যক্তিবর্গ।তিনি একটা ডাক্তারকে সাথে নিয়ে আসলেন।ডাক্তার মহামারী করোনা ভাইরাসের উপর গুরুত্বরোপ করে স্বাস্থবিধি মেনে সর্তকতার সাথে চেক-আপ করে জানালো নিখিল মৃত।সবাই হতবাক করে তাকিয়ে আছে নিখিলের দিকে।কেউ নিখিলের পাশে আসছেন না। সবাই আগের মতো করেই দর্শক হয়ে তাকিয়ে দেখছেন একটা মৃত্যুর করুন দৃশ্য! রহিম সাহেব এবার একটু রাগান্বিতভাবে বললেন, আপনারা এত মানুষ এখানে দাঁড়িয়ে কি করেন? আপনাদের কাজ কি? অসুস্থ প্রতিবেশীর চিকিৎস্নার জন্য একটা ডাক্তার পর্যন্ত আনতে পারেন নি,আপনারা কিসের প্রতিবেশী এই বলে রহিম সাহেব নিশ্চুপ হয়ে যান কিছুক্ষণের জন্য। নিখিলের মা বোবা হয়ে তাকিয়ে আছে এখনো এক দৃষ্টিতে।

ছোট ভাইগুলো আর বোনটা কাঁদছে চিৎকার করে। যেহেতু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মৃত্যু,তাই করোনা ভাইরাসের কথা চিন্তা করে কেউ নিখিলের কাছে যায়নি।উপজেলা থেকে বিশেষজ্ঞ কিছু ডাক্তার আসলো নিখিলের নমুনা সংগ্রহের জন্য। নমুনা পাঠানো হলো বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। সাথে নিখিলের পরিবারের সবাইকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।নিখিলের দাপন-কার্য সবাই সতর্ক থেকে দূরত্ব বজায় রেখে সম্পূর্ণ করে।দাপন-কার্যে প্রশাসন ব্যতিত বেশি লোক জড়ানো হয়নি।নিখিলের মা এখনো আগের মতোই,কারো সাথে কথা বলছেন না। সম্ভবত ছেলের শোকে যেনো পাথর হয়ে গেছে তাই কারো সাথে কথা বলছেনা।একদম বোবা আকৃতি ধারণ করলো নিখিলের মা!

পরবর্তী দিন রিপোর্ট আসে নিখিলের করোনা পজিটিভ অর্থাৎ নিখিল করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।

করোনায় আক্রান্ত নিখিল

You Might Also Like

No Comments

Please Let us know What you think!?

%d bloggers like this: